× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পরিবেশ-প্রতিবেশ

জলবায়ু বিপর্যয় রোধে বিপত্তি

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:০৮ পিএম

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:১০ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

২ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৭টা। তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়া রেললাইনের পাশে জটলা পাকিয়ে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছে অনেক মানুষ। দাঁড়িয়ে কিংবা বসে তাদের কেউ কেউ আবার গায়ের কাপড় খুলে সেটি দিয়েই বাতাস নিচ্ছে। নাখালপাড়া থেকে মহাখালী রেলগেট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তায় প্রায় প্রতিদিনই মেলে এ রকম চিত্র। নগরের মানুষজন সাধারণত শেষরাত থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে। যারা ভোরবেলাতেই কাজে যায় কিংবা যে পরিবারের কারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রয়োজন থাকে, তাদের কথা অবশ্য আলাদা। কিন্তু নাখালপাড়ার এসব দিনমজুর মানুষ ঘুমাতেই যায় গভীর রাতে। তাদের ঘুমও ভাঙে সকাল ৮টা-৯টার দিকে। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে গরমের কারণে তারা ঘুমাতে পারছে না। তাই রেললাইনের খোলা জায়গায় বসে ঘুম-ঘুম চোখে কথাবার্তা বলতে বলতে বাতাস খাচ্ছে তারা। শুধু রাজধানী ঢাকা কিংবা দেশের কোনো মহানগর-শহর নয়, গ্রামের সকালগুলোও এখন কেমন ভ্যাপসা গরম, উত্তপ্ত পরিবেশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তাই মানুষের মধ্যে এ ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণ গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০১ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। সাগরের উচ্চতা বাড়ছে। বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে পরিবেশ-প্রতিবেশে।

গ্যাস নিঃসরণ কমানোর প্রচেষ্টা এনডিসি 

এই গ্যাস নিঃসরণ কমাতে প্রতিটি দেশ জাতিসংঘের ‘ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ নামের সংস্থার কাছে ন্যাশনালি ডিটারমাইন কন্ট্রিবিউশন বা জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) জমা দিয়ে থাকে এবং নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে থাকে। অর্থাৎ জাতীয় ভিত্তিতে নির্গমন হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রতিটি দেশের প্রচেষ্টাকে এনডিসিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি অনুসারে, সংশ্লিষ্ট ১৯৫টি দেশের প্রতিটিকেই তাদের অর্জনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এনডিসি প্রস্তুত, যোগাযোগ এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানের পরিকল্পনা সংস্কার করতে হয়। চলতি বছর জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের আগে প্রদত্ত এনডিসিগুলোকে এনডিসি ৩.০ বলা হয়।

এনডিসির প্রতিশ্রুতিতে দুই ধরনের পরিকল্পনা উল্লেখ করতে হয়Ñ শর্তাধীন ও নিঃশর্ত। নিঃশর্ত পরিকল্পনায় সেসব উদ্যোগকে বিবেচনায় নেওয়া হয়, যেগুলো বর্তমান স্থানীয় সক্ষমতা ও অর্থায়নের ভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে শর্তাধীন পরিকল্পনাগুলো আন্তর্জাতিক তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল।

লক্ষ্য ৮৪.৯২ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ হ্রাস 

সম্প্রতি বাংলাদেশ এনডিসি ৩.০ প্রণয়ন করেছে। এতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতকৃত এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নের জন্য সর্বমোট ১১৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন শর্তহীন এবং ৯০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন শর্তসাপেক্ষ বিনিয়োগ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনার অধীনে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৮৪ দশমিক ৯২ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন (৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ) শর্তহীনভাবে এবং ৫৮ দশমিক ২ মিলিয়ন টন (১৩ দশমিক ৯১ শতাংশ) শর্তসাপেক্ষে কমানো হবে।

এ ব্যাপারে সম্প্রতি এক কর্মশালায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘এনডিসি ৩.০ কেবল নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্য নয়, বরং এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সংগত ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকার। এজন্য নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও জলবায়ু-অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তা ছাড়া নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্প, সবুজ উদ্যোক্তা তৈরি, গবেষণা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের যুক্ত করতে হবে।’ তিনি স্বাস্থ্য, পানি-স্যানিটেশন, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও অবকাঠামো খাতকে জলবায়ু সহনশীল ও পরিবেশবান্ধব করে তোলার আহ্বান জানান। সেজন্য শিক্ষাব্যবস্থায় জলবায়ু শিক্ষা ও সবুজ দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন উপদেষ্টা।

গত মধ্য সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের এনডিসি ২.০ অর্জনে প্রতিবন্ধকতা, অর্জন ও ৩.০ পরিকল্পনা নিয়ে ‘বাংলাদেশ এনডিসি-৩.০ পাথওয়েস ফর অ্যাম্বিশন, অ্যাকশন অ্যান্ড ফিন্যান্স’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের এনডিসি ২.০ বাস্তবায়নে জলবায়ু অর্থায়ন প্রাপ্তি ঘটেছে প্রয়োজনের মাত্র ১.২৫ শতাংশ। আর এনডিসি ৩.০-তে পাঁচগুণ কার্বন নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা শিল্পোন্নত দেশগুলোর জলবায়ু অনুদানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।

গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশ এনডিসি ২.০-এর আওতায় ২০৩০ সাল নাগাদ শর্তহীন কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার পূরণের পথে রয়েছে। তবে শর্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ২৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জলবায়ু তহবিলের মাত্র ১.২৫ শতাংশ অর্থায়ন পাওয়ায় ৮৯.৪৭ এমটিসিও২ই নিঃসরণ কমানোর পূর্ণ সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো সময়মতো অর্থায়ন করলে এনডিসি ৩.০-এর মাধ্যমে পাঁচগুণ বেশি নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে।

গবেষণায় বলা হয়, এটি কোনো দয়া নয়- বরং ‘দি অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (ওইসিডি) দেশগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের পরীক্ষা। কেননা ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের পরবর্তী জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা এনডিসি ৩.০ পূরণে মোট ৩১৬ বিলিয়ন ডলারের (শর্তহীন ৪৬.৩৮ বিলিয়ন এবং শর্তাধীন ২৭০.১৩ বিলিয়ন ডলার) প্রয়োজন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন শিল্পোন্নত দেশগুলোর জলবায়ু অনুদানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।

গবেষণায় জানানো হয়, বাংলাদেশ ২০১৫ সালে অঙ্গীকার করেছিল ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৫ শতাংশ (শর্তহীন) কমাবে। ২০২১ সালের এনডিসি ২.০-তে এ লক্ষ্য বাড়িয়ে শর্তহীন ৬.৭৩% ও শর্তাধীন ২১.৮৫% নির্ধারণ করা হয়। ইতোমধ্যেই শর্তহীনের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। তবে শর্তাধীন লক্ষ্যপূরণে বড় বাধা আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তির ঘাটতি।

‘এটি কার্বন ন্যায়বিচারের প্রশ্ন’

এ ব্যাপারে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম. জাকির হোসেন খান বলেন, ‘এনডিসি বাস্তবায়নে শর্তসাপেক্ষ অর্থায়ন শুধু বাজেটের হিসাব নয়, এটি কার্বন ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ ও পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের কাছে উন্নত দেশগুলোর অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়নের অঙ্গীকার পূরণ করা তাদের ন্যূনতম দায়।’

একই বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং টেকসই উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, ২০১৫ সালে ইনটেনডেট ন্যাশনালি ডিটারমাইন কন্ট্রিবিউশন (আইএনডিসি) পরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়। ২০১৬ সালে সব দেশ পরিকল্পনা জমা দিল। আমরা সেখানে নিঃশর্তভাবে ৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। পাশাপাশি জানালাম, বৈশ্বিকভাবে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করলে ১৫-১৬ শতাংশ কমানো যাবে। ১৯০টি দেশ তখন পরিকল্পনা জমা দিয়েছিল। ২০২১ সালে এনডিসি ২.০ জমা দেওয়ার সময় আমরা কমিটিতে বলেছিলাম, নিজেরা সাড়ে ৫ বা ৬ শতাংশ কমাব, অর্থায়ন ও প্রযুক্তি দিলে আরও ১৭ শতাংশ কমাব। কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ আমাদের অজ্ঞাতসারে ৪০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার করে জাতিসংঘে পরিকল্পনা জমা দিয়েছিলেন। এখন কথা হচ্ছে, ৪০ শতাংশ কমালে তো বিদ্যুৎ, শিল্প-কারখানা, রেল, বাস সবকিছু বন্ধ করে দিতে হবে। 

তিনি বলেন, সম্প্রতি আমরা এনডিসি ৩.০ জমা দিয়েছি। সেখানে বলা হয়েছে, আমরা সব মিলিয়ে ৫ বা সাড়ে ৫ শতাংশ কমাব। এর বেশি হলে উন্নয়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।

ভবিষ্যতে অর্থপ্রাপ্তি আরও কঠিন হয়ে পড়বে : পরিবেশ অধিদপ্তর

এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নে কোন দিকটি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন) মির্জা শওকত আলী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আনকন্ডিশনাল ৬.৩৯ ও কন্ডিশনাল ১৩.৯২ শতাংশ কার্বন কমানোর ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হচ্ছে। সেখানে ২০৩০ সাল নাগাদ ২৫ শতাংশ রিনিউয়েবল এনার্জি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমরা রিনিউয়েবল এনার্জি থেকে উৎপাদন করব।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির কারণে আমাদের অনুদানভিত্তিক যে পরিমাণ অর্থ পাওয়ার কথা তা দেওয়া হচ্ছে না। বিশ্ব সম্প্রদায় অনুদানের পরিবর্তে ঋণ দিতে চায়। আগামীতে আমরা উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হচ্ছি, সেক্ষেত্রে অর্থ প্রাপ্তি আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা