× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজনৈতিক তদবিরে প্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়ন নয়

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:৫২ পিএম

রাজনৈতিক তদবিরে প্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়ন নয়

অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক তদবিরে প্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়ন না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলীয় আনুগত্য নয়, এখন থেকে যোগ্যতা, মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা হবে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে সরকার এই নীতিগত পদক্ষেপ নিতে চলেছে। নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এতে দলীয় তদবিরে পদোন্নতির যে সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চালু ছিল, তা বন্ধ হবে; অন্যদিকে প্রশাসন জনগণের আস্থা অর্জন করবে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে রাজনৈতিক তদবির বেড়ে যাওয়ায় নীতিনির্ধারক মহলে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া গত ১৪ মাসে ধর্মভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দলঘনিষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণকারী পদে বসানো নিয়ে অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়েও আলোচনা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে- প্রশাসনে কোনো রাজনৈতিক তদবির গ্রহণ করা হবে না।

সুপারিশের সংস্কৃতি

গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী পদচ্যুত হওয়ার পর প্রশাসন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ৮ আগস্ট বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরামর্শে অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। প্রশাসনের স্থবিরতা দূর করতে ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান ও পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ উদ্যোগের প্রথম ধাপে আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চিত ও অবসরে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তাকে সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে রাজনৈতিক কারণে পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি শুরু হয়। এ লক্ষ্যে একজন সাবেক সচিবের নেতৃত্বে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশে বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, পদোন্নতির তালিকায় অনেক কর্মকর্তাই ছিলেন যাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই বিভাগীয় মামলা বা দুর্নীতির অভিযোগ আছে। উল্লেখ্য, তখন একাধিক রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে পদোন্নতির লক্ষ্যে তাদের ঘরানার ও পছন্দের কর্মকর্তাদের নামের তালিকা দেওয়া হয়। এমনকি জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র সমন্বয়কদের মধ্য থেকেও এ ধরনের সুপারিশ করা হয় এবং সেগুলোকে বিশেষ প্রাধান্যও দেওয়া হয়।

ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির সংখ্যায় রেকর্ড 

গত ১৪ মাসে ৭৬৪ জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১৯ জন সচিব, ৫২৮ জন অতিরিক্ত সচিব, ৭২ জন যুগ্ম সচিব এবং ৪১ জন গ্রেড-১ পদে উন্নীত হয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ৭৬৮ জন কর্মরত কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন। এর মধ্যে ১২ জন সচিব বা সমপর্যায়ের, ১৩৫ জন অতিরিক্ত সচিব, ২২৬ জন যুগ্ম সচিব এবং ১২৫ জন উপসচিব হিসেবে উন্নীত হন। সবশেষ গত ২৮ আগস্ট একযোগে ২৬৮ জন কর্মকর্তাকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তাদের বেশিরভাগই ৩০তম বিসিএস ব্যাচের।

পদের চেয়ে কর্মকর্তা বেশি

এত পদোন্নতির পর প্রশাসনে এখন পদের চেয়ে কর্মকর্তা বেশি- যা প্রশাসনিক ভারসাম্যে নতুন সংকট তৈরি করেছে। উপসচিব পদের জন্য অনুমোদিত কর্মকর্তার সংখ্যা ১০০০, কিন্তু কর্মরত রয়েছেন প্রায় ১৫৯৬ জন। অতিরিক্ত সচিব পদে অনুমোদিত সংখ্যা ২১২টি, দায়িত্বে রয়েছেন ৩৪৩ জন। যুগ্ম সচিব পদে অনুমোদিত ৫০২ জন, কিন্তু দায়িত্বে আছেন ১০২৭ জন কর্মকর্তা। এ অবস্থায় অধিকাংশ নবপদায়িত কর্মকর্তাকে ‘ইনসিটু’ অর্থাৎ আগের দায়িত্বেই থাকতে হচ্ছে। ফলে পদোন্নতির সুবিধা সীমাবদ্ধ থাকছে কেবল পদমর্যাদা ও বেতন কাঠামোয়।

রাজনৈতিক তদবিরে অস্বস্তি

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথমদিকে রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রশাসনে বিএনপি-জামায়াত-ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। এরই সুযোগ নিয়ে কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দলের প্রভাবশালী নেতা তাদের অনুসারী কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে তদবির শুরু করেন। আবার পদোন্নতি ও পদায়নের জন্য একশ্রেণির আমলা জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের ওপরও ভর করেন। 

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একটি ধর্মভিত্তিক দলের তালিকা আসার পর থেকেই প্রশাসনে তদবিরের চাপ বেড়ে যায়। অনেকেই পছন্দের মন্ত্রণালয়ে সচিব হতে চান। এ নিয়ে সরকারের ভেতরেও ক্ষোভ তৈরি হয়। বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে এ নিয়ে সরকারের কাছে অভিযোগ করা হয়। এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে অলিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়, কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা তদবিরে পদোন্নতি বা পদায়ন করা যাবে না। মন্ত্রণালয় বা বিভাগে সচিব নিয়োগ হবে কর্মদক্ষতা, সততা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় জ্যেষ্ঠতা নয়, বরং দক্ষতা ও মূল্যায়নকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ফাইল স্থগিত রাখা হবে।’

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা 

এ প্রসঙ্গে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের এমন উদ্যোগ প্রশাসনের জন্য ইতিবাচক। তবে বাস্তব ফলাফল পেতে হলে পদোন্নতির পুরো প্রক্রিয়া ইনস্টিটিউশনাল করতে হবে। রাজনৈতিক তদবিরে নিয়োগ বন্ধ রাখতে হলে পারফরম্যান্স ইভ্যালুয়েশন সিস্টেমে সংস্কার আনতে হবে।’ 

তিনি বলেন, ‘ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য ছিল। কিন্তু সেটি যদি নিয়ম ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে যোগ্য কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হন। তখন প্রশাসনে ভারসাম্য নষ্ট হয়। নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা ফেরানো। তবে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। দলনিরপেক্ষরা যেন বঞ্চিত না হন, সে বিষয়টিতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।’ 

এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব একেএম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের এমন সিদ্ধান্ত সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনে দীর্ঘদিনের দলীয় প্রভাবের অবসান ঘটতে পারে।’

সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে নীতিগত এই পরিবর্তন মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কেউ এটাকে প্রশাসন সংস্কারের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছেন, কেউ আবার বলছেন এটি শুধু কথার ফুলঝুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার যদি সত্যিই প্রশাসনকে রাজনীতি থেকে আলাদা করতে চায়, তবে পদোন্নতি ও পদায়ন প্রক্রিয়া স্বাধীন বোর্ডের অধীনে আনতে হবে। দুর্নীতি বা অসদাচরণের অভিযোগে জড়িত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি স্থায়ীভাবে স্থগিত রাখতে হবে। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়গুলোতে দায়িত্বভিত্তিক মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। তারা বলছেন, নীতি ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োগই হবে মূল পরীক্ষা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা