ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৫ ১০:২০ এএম
জনবান্ধব পুলিশিং ও জবাবদিহিতামূলক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশন গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সুপারিশ হস্তান্তর করেছিল। কিন্তু সেসব সুপারিশের বেশ কয়েকটি বাস্তবায়নের পথে থাকলেও বেশিরভাগেরই কাজ চলছে মন্থরগতিতে।
সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে এরকম দেখা গেছে। সভায় পর্যালোচনাক্রমে দেখা গেছেÑ মানবাধিকার সুরক্ষা থেকে শুরু করে আধুনিক ফরেনসিক সুবিধা স্থাপন, নৌপথে অপরাধ দমন, নারী পুলিশ নিয়োগ ও জিপিএস ট্র্যাকিং ব্যবহারের মতো কয়েকটি ক্ষেত্রে কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু হেল্পলাইন চালু, ভাসমান থানা গঠন কিংবা এফআইআর-বহির্ভূত গ্রেপ্তার রোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো কার্যকর হয়নি।
মানবাধিকার সুরক্ষায় র্যাবের কার্যক্রম পর্যালোচনা
সংস্কার কমিশনের অন্যতম আলোচিত প্রস্তাব ছিল র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) অতীত কার্যক্রম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পর্যালোচনা করা। এ লক্ষ্যে উপদেষ্টা মর্যাদাসম্পন্ন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়ন বিষয়ক) লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজকে আহ্বায়ক করে ৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এ কমিটির একাধিক সভায় সংস্কারের প্রস্তাবনাগুলোর ওপর আলোচনা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন এখনও চূড়ান্ত হয়নি। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, প্রতিবেদন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা বাড়বে না। তবে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ পর্যালোচনায় রাজনৈতিক চাপমুক্ত অবস্থান জরুরি।
পুলিশের মানবাধিকার লঙ্ঘনে নতুন হেল্পলাইন নয়
কমিশন সুপারিশ করেছিল, পুলিশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আলাদা হেল্পলাইন চালু করতে। কিন্তু পুলিশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বিদ্যমান জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-কেই আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। বর্তমানে ৯৯৯-এ রয়েছে ১০০টি ওয়ার্ক স্টেশন। এটি বাড়িয়ে ৫০০ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত ডিপিপি পাঠানো হয়েছে, যার প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৫৫২ কোটি টাকা।
সভার কার্যপত্র সূত্রে জানা গেছে, সাক্ষী সুরক্ষা আইন জরুরি প্রয়োজন হলেও বাস্তবায়নের অগ্রগতি ধীর। অথচ এ বিষয়ে কমিশন বলেছিল, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সুরক্ষা আইন জরুরি। বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও অগ্রগতি ধীর। বর্তমানে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ (সংরক্ষণ) আইন ২০১১-এ কিছুটা সাক্ষী সুরক্ষার ধারা থাকলেও তা অপর্যাপ্ত। নতুন আইন প্রণয়ন করলে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হবে।
পুরনো আইন সংস্কারে জটিলতা
১৮৬১ সালের পুলিশ আইন, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি এবং ১৯৪৩ সালের পিআরবি (পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল) যুগোপযোগী করার সুপারিশ দীর্ঘদিনের দাবি। কমিশন বলেছে, এ আইনগুলোতে মানবাধিকার সুরক্ষার ধারা যুক্ত করতে হবে। ইতোমধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির কয়েকটি ধারা সংশোধন করে দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি হয়েছে। তবে তিনটি আইনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকায় সবগুলো একসঙ্গে সংস্কার করা কঠিন। এজন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নৌ পুলিশ ও ফরেনসিক সুবিধা সম্প্রসারণ
বাংলাদেশের প্রায় ২৪ হাজার ১৪০ বর্গকিলোমিটার জলপথে অপরাধ দমনে কমিশন ভাসমান থানা স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। তবে পুলিশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভাসমান থানা না করে বিদ্যমান নৌ পুলিশকে আধুনিক প্রযুক্তি ও বাড়তি জনবল দিয়ে শক্তিশালী করাই বেশি কার্যকর হবে। এ লক্ষ্যে নৌযান ও লজিস্টিক জোগানের জন্য একটি পৃথক প্রকল্প প্রণয়নাধীন।
প্রতিটি বিভাগে ডিএনএ ল্যাব ও ক্রাইমসিন ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্কার কমিশন। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ফরেনসিক ল্যাব চালু রয়েছে। এরই মধ্যে বাকি ৬ বিভাগে সায়েন্টিফিক ইন্টিগ্রেশন সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ২৯২ কোটি টাকা।
নারী আসামিকে নারী পুলিশ দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ
প্রতিটি থানায় আলাদা স্বচ্ছ কাচের জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকতে হবেÑ এমন সুপারিশ করেছিল কমিশন। নতুন থানাগুলোতে এটি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পুরনো থানাগুলোতে তা বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে। কমিশন নির্দেশনা দিয়েছে, নারী আসামিকে অবশ্যই নারী পুলিশের উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। পুলিশ মহাপরিদর্শক সভায় জানিয়েছেন, এ নিয়ম ইতোমধ্যে কার্যকর রয়েছে। পুলিশ বাহিনীতে আরও ৫০০ নারী এএসআই নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে পুলিশে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে এবং জনগণের আস্থাও বাড়বে।
জিপিএস ট্র্যাকিং ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা
অভিযানে পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে জিপিএস ট্র্যাকিং ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে কমিশন। বর্তমানে গাজীপুর মেট্রোপলিটনে এ উদ্যোগ পাইলট প্রকল্প হিসেবে চলছে। এটি দেশব্যাপী বাস্তবায়নে প্রায় ৪০ হাজার ডিভাইস প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া গৃহ তল্লাশির সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়েছে।
নাগরিক নিরাপত্তায় জরুরি কল সার্ভিস স্থগিত
তল্লাশির সময় পুলিশ কর্মকর্তারা পরিচয় না দিলে নাগরিকরা যেন জরুরি কল সার্ভিসে অভিযোগ করতে পারেনÑ এমন আরেক প্রস্তাব করেছিল কমিশন। কিন্তু পুলিশ বলেছে, ৯৯৯-কে আরও শক্তিশালী করাই যথেষ্ট। তাই আলাদা কল সার্ভিস চালু হয়নি। কমিশনের সুপারিশ ছিল, আদালতের নির্দেশ ছাড়া এফআইআর-বহির্ভূত আসামিকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। কিন্তু পুলিশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এতে অপরাধীরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। তাই এ প্রস্তাব কার্যকর করা ঠিক হবে না। সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
বিশেষজ্ঞ অভিমত
মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ডা. আবু তোহা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো পুলিশকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিতামূলক করা। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া পূর্ণ সংস্কার সম্ভব নয়। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধের প্রকৃতি বদলেছে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং জরুরি। কমিশনের অনেক সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে অপরাধ দমন আরও কার্যকর হবে। জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিত করতে শুধু সিদ্ধান্ত নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।