× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এটুআই প্রকল্পে নয়া ফন্দি

কয়েকশ কোটি টাকার অনিয়ম, তদন্তে দুদক

আরমান হেকিম

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৩৩ পিএম

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৩৪ পিএম

কয়েকশ কোটি টাকার অনিয়ম, তদন্তে দুদক

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প অ্যাসপায়ার টু ইনোভেটে (এটুআই) ফের নতুন করে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে বিতর্কিত এ প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটির মেয়াদ মাত্র এক বছর বাকি থাকলেও নতুন প্রস্তাবে ব্যয় ২৪ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি কেনার বরাদ্দ ৩৪ গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি খাতে ব্যয় ৫০ শতাংশের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, চলতি বছরের শুরুর দিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রকল্প কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে কয়েকশ কোটি টাকার অনিয়মের প্রমাণ পায়। এসব ঘটনায় ১৪ জনকে বহিষ্কার করা হয় এবং তদন্ত এখনও চলমান।

ব‍্যাপক অনিয়মের অভিযোগ থাকায় তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলামও প্রকল্পটি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমন একটি প্রকল্পে নতুন করে ব‍্যয় বৃদ্ধি করা সমীচীন হবে না বলে মত দেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘সুশাসনের ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে অর্থ ব্যয় হবে ঠিকই কিন্তু উন্নয়ন কাজ গুণগত মানসম্পন্ন ও টেকসই হবে না। রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কর্ম এবং ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুফল পেতে হলে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সুশাসন নিশ্চিত হলে কোনোভাবেই নিম্নমানের কাজ কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়। সুশাসনের সঙ্গে জবাবদিহিতার প্রশ্নটিও যুক্ত। এজন্যই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে রিওয়ার্ড ও পানিশমেন্টের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।’

অস্বাভাবিক ব‍্যয় প্রস্তাবে নতুন বিতর্ক 

এটুআই প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় যেসব বিষয়ে আপত্তি ওঠে তার মধ্যে অন‍্যতম হলো কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক ক্রয় প্রস্তাব।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাব আলোচনার মুখে পড়েছে মূলত কয়েকটি খাতে হঠাৎ বড় অঙ্কের বরাদ্দ বৃদ্ধির কারণে। বিশেষত কম্পিউটার কেনার বাজেট ২৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫ কোটি ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা আগের তুলনায় ৩৪ গুণ বেশি।

এ ছাড়া সফটওয়্যার উন্নয়নে ১৯০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সর্বশেষ সংশোধনের তুলনায় ৫৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা বেশি। বৈঠকে কমিশনের কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রায় ছয় বছর ধরে চলমান এ প্রকল্পে হঠাৎ এত বরাদ্দ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা কী।

অন্যদিকে, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী ও আসবাবপত্রসহ ১৩টি খাতে মোট ৪৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে সাবস্ক্রিপশন ফি বাবদ ৫ কোটি টাকা এবং আপ্যায়ন ও সম্মানীর জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা।

প্রকল্প পরিচালকের অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৬২৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৭৩ শতাংশ। একই সময়ে প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৭৮ শতাংশ।

মোট ব‍্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে সভায় বলা হয়, দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাবে তথ‍্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ২০৫ কোটি টাকা ব‍্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়। যা বর্তমান ব‍্যয়ের চেয়ে প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি। আর মূল অনুমোদিত ব‍্যয়ের তুলনায় ১১৯ শতাংশ বেশি।

সভায় জানানো হয়, এটুআই উদ্যোগটি ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় ফেরার পর চালু হয়। ২০০৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) অর্থায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) নামে প্রকল্পটি শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ২০১৮ সালে এটুআই প্রোগ্রামকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে নেওয়া হয়। পরে ২০২০ সালে অ্যাকসেস টু ইনফরমেশনের নাম পরিবর্তন করে এসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) নামে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৪৮৫ কোটি টাকা।

প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে। তবে তা প্রথম সংশোধনের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয় এবং ব্যয় ধরা হয় ৮৫৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ প্রস্তাব অনুমোদিত হলে মোট ব্যয় দাঁড়াবে ১ হাজার ৬০ কোটি টাকা।

আইসিটি বিভাগের বাস্তবায়িত প্রকল্পটি দেশের ডিজিটাল শাসনব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। এর আওতায় ই-নথি, জাতীয় পোর্টাল, মুক্তপাঠ, মাইগভ ও একপের মতো সেবা চালু রয়েছে।

সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নতুন গঠিত ‘এজেন্সি টু ইনোভেট’ পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত এই সেবাগুলো চালু রাখতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো জরুরি। ২০২৩ সালে পাস হওয়া এজেন্সি টু ইনোভেট আইন অনুযায়ী, এটুআই প্রকল্পের সব কার্যক্রম ওই সংস্থার অধীনে হস্তান্তর করা হবে। সংস্থাটি ২০২৬ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রকল্প কর্মকর্তাদের দাবি, বাড়তি বরাদ্দের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্লাটফর্মের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম চালু রাখা, তথ্য নিরাপত্তা ও ব্যাকআপ জোরদার করা এবং আইসিটিনির্ভর ‘নিউ বাংলাদেশ (রিফর্ম)’ উদ্যোগকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।

লুটপাটের অনুসন্ধানে দুদক

কয়েকশ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অভিযানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এটুআই অফিসে অভিযান চালিয়ে বেশকিছু নথিপত্র উদ্ধার করেছে। যেগুলোর অনুসন্ধান এখন চলমান। 

অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া দুদকের সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ বলেন, ‘এটুআই প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট ১৫০-এর বেশি টেন্ডার খতিয়ে দেখা হয়েছে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধিমালা (পিপিআর) লঙ্ঘন করে ওই টেন্ডারগুলোতে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছেÑ এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া, স্পেসিফিক/লজিক্যাল জাস্টিফিকেশন ছাড়া কার্যাদেশের ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। যার মাধ্যমে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে থাকতে পারে। এটুআই ২০১৯ সালে ই-পেমেন্ট সার্ভিস ‘একপে’ চালু করে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, তাদের অনুমোদন ছাড়াই চালু হয় ‘একপে’। এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি। 

এটুআই হেড অব প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট আব্দুল্লাহ আল ফাহিম জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মেলায় ১৪ কর্মকর্তা ও কনসালটেন্টের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত বা পরবর্তী পদক্ষেপের প্রক্রিয়া চলমান থাকায় তাদের দায়িত্ব পালন হতে বিরত রাখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনিয়মের পেছনে সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনাইদ আহমেদ পলকের সম্পৃক্ততাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অর্ধেক কাজ পায় চার কোম্পানি

এটুআই প্রকল্পের কেনাকাটা ঘিরে গড়ে উঠেছিল সিন্ডিকেট। এদের মধ্যে অন‍্যতম ছিল, অরেঞ্জ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট (অরেঞ্জবিডি), ট্যাপওয়্যার সলিউশনস ও সফটবিডি।

এটুআইয়ে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেনাকাটার তথ‍্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একক ও যৌথভাবে ছয়টি করে কাজ পেয়েছে ট্যাপওয়্যার সলিউশনস, সফটবিডি ও বিজনেস অটোমেশন। একক ও যৌথভাবে পাঁচটি কাজ পেয়েছে অরেঞ্জবিডি।

সব মিলিয়ে ৪টি কোম্পানি পেয়েছে ২৩টি কাজ। বাকি ২৩টি কাজ একক ও যৌথভাবে পেয়েছে ২০টি কোম্পানি। তিনটি কোম্পানি-অরেঞ্জবিডি, ট্যাপওয়্যার সলিউশনস ও সফটবিডির বিরুদ্ধে এটুআইয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কেনাকাটার ক্ষেত্রে শর্ত এমনভাবে তৈরি করা হতো, যাতে তারা কাজ পান।

উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা ডিপিপি সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি উদ্দেশ্য নিয়ে প্রকল্প শুরু হয় যার মধ্যে ছিল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের এসডিজি অর্জনকে দ্রুততর করা, সরকারি সেবাগুলো ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সময়, খরচ ও যাতায়াত কমিয়ে সুশাসনে সততার পরিবেশ সৃষ্টিতে সহযোগিতা প্রদান, সরকারের মধ্যে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা, ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম তৈরিতে সহায়তা প্রদান করা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা