ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ১০:০২ এএম
আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ১০:০৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
পরবর্তী জনপ্রশাসন সচিব কে হচ্ছেন? এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। রাজনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যেও এ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। কারণ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাই আগ্রহ নিয়ে অনেকেই নজর রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদটির দিকে। শুধু তাই নয়, একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র জানাচ্ছে, কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এ পদে তাদের অনুগত কর্মকর্তাকে বসাতে গোপনে জোর লবিং শুরু করেছে।
বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসে প্রশাসনে একাধিকবার কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়ন এবং পদোন্নতি ঘটেছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ আগ্রহ না দেখালেও জনপ্রশাসন সচিব কে হচ্ছেন, তা নিয়ে তাদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে। বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে এ পদটির ভূমিকা মুখ্য হওয়ায় তারা এই নিয়োগের দিকে তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখছেন। রাজনীতিকরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন বদলির গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। সে কারণে এ পদটিতে কে আসছেন, এ প্রশ্নের উত্তরও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, জনপ্রশাসন সচিব নিয়োগ অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, সৎ, যোগ্য ও জনপ্রশাসন সম্পর্কে অভিজ্ঞ পেশাদার কর্মকর্তাকে এ পদে নিয়োগ দিতে হবে। সূত্র জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যাওয়ার আগেই প্রধান উপদেষ্টা সম্ভাব্য এমন একজন কর্মকর্তাকে নিয়ে সরকারের এক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে গেছেনÑ যিনি অভিজ্ঞ ও পেশাদার কর্মকর্তা। এর পরপরই এ সংক্রান্ত সার-সংক্ষেপ প্রস্তুত করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এটি অনুমোদনের জন্য আজ রোববার কিংবা আগামীকাল সোমবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হতে পারে।
প্রসঙ্গত, চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমানকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে গত ২১ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে সদস্য হিসেবে বদলি করা হয়। এরপর থেকে প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ পদটি শূন্য রয়েছে। এ মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসনের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী নির্বাচনে ডিসিসহ মাঠ প্রশাসনে কারা দায়িত্ব পালন করবেন, সেটি এখন মুখ্য আলোচ্য বিষয়। সচিবদের মধ্যে যিনি গ্রহণযোগ্য, সৎ, যোগ্য এবং প্রশাসন পরিচালনায় দক্ষ কর্মকর্তা হবেন, তাকেই জনপ্রশাসনের সচিব পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। গত ১৪ মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নিয়োগ নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় এখন চাইছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে। এজন্য জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জনপ্রশাসন সচিব পদে নিয়োগের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে অন্যদিকে কয়েকজন উপদেষ্টা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের পক্ষের অনুগত কর্মকর্তাকে এ পদে নিয়োগের জন্য জোর তদবির করছেন বলে জানা গেছে।
ভোটের আগে প্রশাসন নিয়ে বিএনপিকে নতুন করে ভাবতে হবে
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রতি আদর্শিকভাবে সহানুভূতিশীল এমন কর্মকর্তাদের গত ১৪ মাসে পদায়ন বা বদলি করা হচ্ছে না। প্রসঙ্গত, সাবেক সচিব সামসুল আলমকে সিনিয়র সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে সার-সংক্ষেপ আদেশ জারি করা হয়েছে বলে জানা গেলেও বিষয়টি সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। এ ব্যাপারে সাবেক সচিব সামসুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাকে চুক্তিতে সিনিয়র সচিব নিয়োগের প্রস্তাব দেয় এবং সার-সংক্ষেপ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়, তবে চূড়ান্ত আদেশ জারি হয়েছে কি না তা স্পষ্ট নয়। তিনি জানান, প্রশাসনে সচিব পদে যাদের পদায়ন করা হয়েছে বিএনপির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং তারা সচিব পদে নিয়োগ পেয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার মতে, ভোটের আগে প্রশাসন নিয়ে বিএনপিকে নতুন করে ভাবতে হবে, প্রশাসনকে নতুনভাবে সাজাতে হবে।
এদিকে দুর্গাপূজার টানা ৪ দিন ছুটি শেষে আজ রবিবার প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় থেকে শুরু করে সরকারি অফিস-আদালত খুলছে। সূত্র জানাচ্ছে, এবার যদি বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের ইচ্ছায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ অন্য কোনো শূন্য সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে বিএনপি কঠোর অবস্থানে যাবে বিএনপি। তবে এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি।
প্রশাসনে একটি ধর্মভিত্তিক দলের অনুগতদের বসানো হচ্ছে : রুহুল কবির রিজভী
এদিকে গতকাল শনিবার ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এ্যাব) নবগঠিত কমিটির সদস্যদের নিয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা শেষে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ তুলে বলেছেন, ‘প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে একটি ধর্মভিত্তিক দলের অনুগতদের বসানো হচ্ছে। দল অনুগত প্রশাসন দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের জন্য জনগণ প্রস্তুত, তারা পূর্বের মতো ডামি নির্বাচন চান না। নতুন ইস্যু তৈরি করে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। বর্তমান সরকারের ১৪ মাসে প্রশাসন দখলের জন্য তারা যেটা করছে দেশের মানুষ তা জেনে গেছে।’
রাজনৈতিক নানা বিবেচনা
একাধিক সূত্র জানাচ্ছে, জনপ্রশাসন সচিব পদে নিয়োগ নিয়ে এখন পর্যন্ত ৫-৬ জন কর্মকর্তার নাম আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে। যাদের মধ্যে বর্তমানে চুক্তিতে নিয়োজিত ২-৩ জন সিনিয়র সচিবও আছেন। এ ছাড়া বাকিরা নিয়মিত ব্যাচের। জনপ্রশাসন সচিব নিয়োগের বিষয়টি জটিল সমীকরণে আটকা পড়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো নামই চূড়ান্ত না হলেও আজ রবিবার চূড়ান্ত হতে পারে। একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল চাইছে তাদের পছন্দের একজন সচিবকে গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসনে বদলি করে আনতে। আবার সেখানে নিতে চাইছে তাদেরই পছন্দের আরেকজন সচিবকে। তিনিও উন্নয়নসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত রয়েছেন। ওই কর্মকর্তা সাবেক জনপ্রশাসন সচিবের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন বলে প্রশাসনে চাউর আছে। এর মানে, নির্বাচনের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ই থাকবে তাদের নিয়ন্ত্রণে। তবে এ উদ্যোগে পুরোপুরি ভেটো দিয়েছে দেশের বৃহত্তম একটি রাজনৈতিক দল।
ইতোমধ্যে দলটির পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে জানানো হয়েছে, দলবাজ হিসেবে চিহ্নিত কোনো কর্মকর্তাকে তারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে দেখতে চান না। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একজন শতভাগ পেশাদার, সাহসী, সৎ ও দক্ষ সচিব নিয়োগ দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সিনিয়র আমলাদের মধ্যে ভূতাপেক্ষভাবে সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়া ১৯৮৫ ব্যাচের এক কর্মকর্তাকেই বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন বলে বিবেচনা করছেন। ইতোমধ্যে এই কর্মকর্তা সচিবালয়ে কর্মচারী আন্দোলন সামাল দেওয়াসহ আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতি-বঞ্চিতদের পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নিয়মিত ব্যাচ থেকে নিয়োগ দেওয়া হলেও একই নীতি অনুসরণ করলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভবপর হবে। পেশাদার আমলা ছাড়া দলীয়ভাবে চিহ্নিত কাউকে নিয়োগ দেওয়া উচিত হবে না। অপরদিকে বর্তমানে চুক্তিতে নিয়োজিত সচিবদের মধ্যে যারা নিজ মন্ত্রণালয়ে উল্লেখযোগ্য সফলতা দেখাতে পারেননি তাদেরকেও জনপ্রশাসনে পদায়ন করা ঠিক হবে না।