অবৈধ মাছ শিকার
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:২৬ এএম
আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:২৭ এএম
ছবি সংগৃহীত
উপকূলীয় জেলায় দুর্গম চ্যানেল ও দ্বীপ অঞ্চলে অবাধে মৎস্য আহরণের ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মৎস্য ও জলজ সম্পদ ক্ষতির মুখে পড়ছে। এমনকি বিদেশি ট্রলার ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরার কারণে দেশের অর্থনীতি ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গভীর সমুদ্রে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে উন্নত মানের ড্রোন ক্রয় করতে চাইছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
উপকূলীয় এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমে মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও নজরদারি প্রকল্প ‘অ্যাকুয়াগার্ড’ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
প্রাপ্ত নথি সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় উন্নত ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন ব্যবহার করে সমুদ্র সংলগ্ন খুলনা-বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা দুর্গম চ্যানেলে উপকূলীয় নদী ও সমুদ্রে রিয়েল টাইম নজরদারি চালানো হবে। কক্সবাজার, নোয়াখালী চট্টগ্রাম, ভোলা ও বরগুনা উপকূলীয় চর এবং দ্বীপে একই ধরনের অভে; জালের ব্যবহারের মাধ্যমে গোপনে মাছ আহরণ অব্যাহত রয়েছে। ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করলে এসব অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এর আগে ড্রোন বিষয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাথে একটা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
এই প্রকল্প জাতিসংঘ এসডিজি লক্ষ্য-১৪ এর (সমুদ্রসম্পদ সংরক্ষণ) ছাড়াও লক্ষ্য-১ (দারিদ্র্য বিমোচন) ও লক্ষ্য-২ (ক্ষুধামুক্তি) অর্জনে অবদান রাখবে। কারণ মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে দেশের আমিষের চাহিদা পূরণ হবে। একই সাথে জেলেদের কর্মসংস্থানও বাড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও অবৈধভাবে মাছ ধরা প্রতিরোধে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে সাশ্রয়ী, দ্রুত ও কার্যকর নজরদারি সম্ভব হলে উপকূলীয় জেলেদের জীবিকা যেমন সুরক্ষিত হবে। তেমনি দেশের সামুদ্রিক সম্পদও রক্ষা পাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে একটি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। উন্নত মানের ক্যামেরা, সেন্সর ও স্যাটেলাইট সংযোগযুক্ত এসব ড্রোন গভীর সমুদ্রেও অনিয়ন্ত্রিত ট্রলার চিহ্নিত করতে সক্ষম হবে। এ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প প্রস্তুত করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ ও জলজপ্রাণীর উন্নয়নের জন্য কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি না করে প্রকল্প অনুমোদন করে দেওয়া উচিত হবে।
দেশের সমুদ্র সংলগ্ন কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, খুলনাসহ ১৯টি উপকূলীয় জেলায় (৭০টি উপজেলা) লাখ লাখ জেলে মাছ ধরায় নিয়োজিত। কিন্তু নজরদারির অভাবে অবৈধ জাল ব্যবহার, নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা ও গভীর সমুদ্রে দেশি ও বিদেশি ট্রলারের সীমা লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে সরকার প্রতি বছর সমুদ্রে ৫৮ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ রাখে এবং পাঁচটি ইলিশ অভয়াশ্রমে টানা চার মাস মাছ ধরা বন্ধ রাখে। কিন্তু পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় এসব আইন যথাযথভাবে কার্যকর হয় না। বর্তমানে নৌপথে বা স্পিডবোটে নজরদারি চালাতে সময় ও ব্যয় দুটোই বেশি লাগে। ড্রোন প্রযুক্তি এক্ষেত্রে হবে সাশ্রয়ী ও কার্যকর সমাধান। রাত-দিন রিয়েল টাইম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে জালের ধরন, ট্রলারের চলাচল ও নিষিদ্ধ এলাকায় নৌযান প্রবেশ সহজেই শনাক্ত করা যাবে। তই এসব বাস্তবায়ন করতে কেনা হবে দীর্ঘপাল্লার ৪টি ফোরকে ক্যামেরাসহ (১৫০-১৭৫ কিমিটার) এবং স্বল্পপাল্লার ২০টি ড্রোন ফোরকে ক্যামেরাসহ (২৫-৩০ কিলোমিটার)। প্রতিটি ড্রোনে থাকবে হাই-রেজল্যুশন ক্যামেরা, জিপিএস-আরটিকে মডিউল ও ব্যাকআপ ব্যাটারি। এ ছাড়া থাকবে ক্লাউড সার্ভার, মনিটরিং ড্যাশবোর্ড, জিও-ফেন্সিং ও এআই অবজেক্ট ডিটেকশন সফটওয়্যার। এ ছাড়া প্রায় দুই লাখ জেলেকে আধুনিক এফআইডি কার্ড ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ২৪ জন পরামর্শক ও অপারেটর থাকবে। সরকার ধারাবাহিকভাবে এ উদ্যোগ চালিয়ে যেতে পারলে বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমিক বা সামুদ্রিক অর্থনীতি আগামী এক দশকে দেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। তবে সমন্বিত নজরদারির অভাবে প্রায় সময় বিদেশি ট্রলার অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ আহরণ করছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. খলিলুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রচলিত টহল নৌযান দিয়ে এত বড় এলাকা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। ড্রোন ব্যবহারের ফলে দ্রুত নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হবে। উপকূলীয় জেলায় মৎস্যসম্পদ আহরণে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ড্রোন ব্যবহারের ফলে খুব কম সময়ে অনেক দূরবর্তী এলাকায় তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। এতে বিদেশি জাহাজও শনাক্তকরণ সহজ হবে।
এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ড্রোনের মাধ্যমে শুধু মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণই করা হবে না। বরং জেলেদের নিরাপত্তা, জলদস্যু দমন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় তথ্য সংগ্রহেও এটি ব্যবহার করা হবে।
তিনি আরও বলেন, যদি গভীর সমুদ্রের মাছ আহরণ সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে কেবল জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধিই বাড়বে না, বরং উপকূলীয় অঞ্চলে লাখ লাখ জেলের জীবিকাও সুরক্ষিত হবে।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী উন্নয়ন সমিতির সভাপতি মুহাম্মদ আবু তোহা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ড্রোনভিত্তিক এই নজরদারি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অবৈধ মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণে আসবে। এটি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বড় ভূমিকা রাখবে।
জানা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে সমুদ্রসীমা রক্ষায় ড্রোন ব্যবহার করছে। ভারত তার নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের জন্য ড্রোন ব্যবহার করে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে অবৈধ মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ করছে। ইন্দোনেশিয়া বিদেশি ট্রলার ধরতে ড্রোন ব্যবহার করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। জাপান মাছের প্রজনন মৌসুমে ট্রলার নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত প্রভাব পর্যবেক্ষণে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে চাইছে সরকার।