শাহরিয়ার জামান দীপ
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৪ এএম
আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৯ এএম
প্রতীকী ছবি
দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আর এ চক্রান্তের সাজানো ছকে ইন্ধন জোগাচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক কিছু নেতা। এজন্য দেশের ভেতরে তো বটেই বিদেশের মাটিতেও বসে চলছে ষড়যন্ত্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর একাধিক প্রতিবেদনে পতিত সরকারের পলাতক নেতাদের দেশজুড়ে নৈরাজ্যের পরিকল্পনা এবং এজন্য অর্থায়নের বিষয়টি উঠে এসেছে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, ঝটিকা মিছিল থেকে পুলিশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ ঘটিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি চাইছে রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও নাশকতার মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে। সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ব্যানারে ঝটিকা মিছিলের নামে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে অরাজকতা সৃষ্টি, ককটেল বিস্ফোরণ, পুলিশের কাছ থেকে আটক কর্মীকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ এবং অন্যান্য দেশে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি ও শীর্ষস্থানীয় নেতারা সরকার উৎখাতের বিশেষ এজেন্ডা নিয়ে তৎপর হয়ে পড়েছে। এই উৎখাত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা প্রথমে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। সেই সঙ্গে তারা চাইছে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দাবি, দেশে অরাজকতা তৈরির জন্যই আওয়ামী লীগ রাজপথে নৃশংসতার পথ বেছে নিচ্ছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই নানাভাবে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনায় লিপ্ত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় বড় ধরনের নাশকতামূলক কার্যক্রম না চালাতে পারলেও দেশব্যাপী ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণসহ দলটির নেতাকর্মীরা নানা ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সম্প্রতি একটি নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে দেশের সবকটি মহাসড়ক বন্ধের পরিকল্পনাও করেছিল দলটির পলাতক নেতাকর্মীরা। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিষয়টি আগেভাগেই আঁচ করায় ভেস্তে যায় তাদের পরিকল্পনা।
গত কয়েকদিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঝটিকা অভিযান ও নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সবশেষ গতকাল রবিবার রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তারদের দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে দেশব্যাপী ঝটিকা মিছিল, ককটেল সরবরাহসহ নানা ধরনের ষড়যন্ত্রে অর্থায়নের খবর। গ্রেপ্তাররা পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের নিশ্চিত করেছেন প্রায় চল্লিশজন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতার নাম। যাদের বেশিরভাগই ছিলেন গত সরকারের মন্ত্রী ও এমপি।
একটি গোয়েন্দার সংস্থার নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, অর্থদাতাদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ, শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম।
এ ছাড়া দেশকে অস্থিতিশীল করার কার্যক্রমে অর্থায়নের অভিযোগে গত সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও দলের শীর্ষ নেতাদের মাঝে আরও যাদের নাম এসেছে তারা হলেনÑ শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ হেলাল উদ্দিন, আসাদুজ্জামান খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, হাছান মাহমুদ, তাজুল ইসলাম, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, আলাউদ্দিন আহমেদ নাসিম, শেখ সারহান নাসের তন্ময়, শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, সাদিক আবদুল্লাহ, শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ ফজলে শামস পরশ, আ হ ম মুস্তফা কামাল, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, নসরুল হামিদ বিপু, এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, নির্মল কুমার চ্যাটার্জি, শামীম ওসমান, নিজাম হাজারী, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার ও তার মেয়ে তাহসিন বাহার, লিয়াকত শিকদার, গোলাম সারোয়ার কবির, মাইনুল হোসেন নিখিল, সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ (ইনান), মাজহারুল কবির শয়ন, মহিউদ্দিন মহারাজ এবং শফিকুল ইসলাম শিমুল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী নিশ্চিত করেছে উল্লিখিত নেতাদের ব্যাংক হিসাবে গত কয়েক মাসে কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং দুবাই এই তিন দেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি টাকা লেনদেন করছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি জিজ্ঞাসাবাদে নীলফামারী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাদ্দাম হোসেন পাভেলের কাছ থেকে অর্থায়নের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার গেছে। এ ছাড়া নাশকতায় সম্পৃক্ত থাকায় কামাল আহমেদ মজুমদারের ছোট ছেলে শাহেদ আহমেদ মজুমদারসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নাশকতার পরিকল্পনাকারীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। রিমান্ডে আসামিদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অর্থদাতাদের শুধু গ্রেপ্তার নয় তাদের কাছ থেকে আসা অর্থ সরবরাহ বন্ধ করতেও কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দেশবিরোধী সব ধরনের অপতৎপরতা ঠেকাতে ইতোমধ্যেই মাঠ পর্যায়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
জানা গেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক শীর্ষ নেতারা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ লেনদেনে করেন না। তারা অর্থ সরবরাহ করছেন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) এবং হুন্ডির মাধ্যমে। এই নেতাদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব তথ্য পেয়েছে। শুধু তাই নয়, অনেকে নিজের পরিচয় গোপন রেখে স্বজনদের ব্যবহার করে নাশকতার অর্থ সরবারহ করছেন। অনেক নেতার স্বজনদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনাতেও এসব তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। জানা যায়, আওয়ামী লীগের নেতারা সরাসরি কাউকে টাকা পাঠান না। তারা মূলত কাট-আউট পদ্ধতিতে অর্থায়ন করছেন। এক্ষেত্রে তিন থেকে চার হাত ঘুরে নেতাকর্মীদের কাছে টাকা পৌঁছে। এতে কে টাকা পাঠাচ্ছে তা বের করা কিছুটা কঠিন হয়ে যায়।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে নাশকতা ঠেকাতে ডিএমপি বদ্ধপরিকর। নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম রোধে সব থানাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থায়নের বিষয়টি নিয়ে পুলিশের কয়েকটি ইউনিট কাজ করছে, জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
গোয়েন্দারা বলছেন, শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ ৪০ নেতা অর্থ সরবরাহ করছেন। এজন্য তাদের প্রত্যেককে নির্দিষ্ট ফান্ড ঠিক করে দেওয়া হয়েছে, শুধু তাই নয়, আলাদা আলাদা বিভাগের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে একেক জনকে। দলের স্বার্থে তাদের এ কাজ করতে বলা হয়েছে। সামাজিক বিভিন্ন গ্রুপে তাদের এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এমনকি পলাতক অনেক নেতার স্থানীয় সম্পদ বিক্রি করে সেগুলোও দলের নেতাকর্মীদের দেওয়ার তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।