দূতাবাস ও মিশন
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩১ এএম
আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩৪ এএম
কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস। ফাইল ফটো
বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাস ও মিশনে কর্মকর্তা নিয়োগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগীদের পদায়নের অভিযোগ উঠেছে। গত জুলাই মাসে শেখ হাসিনার সুবিধাভোগী ১৭ জন কর্মকর্তাকে সরকার বিভিন্ন দেশে পদায়ন করে। পরিকল্পনা কমিশনে সদস্য পদে সদ্য বদলি হওয়া জনপ্রশাসন সচিব মোখলেস উর রহমানের ইচ্ছায় এসব হয়েছে বলে অভিযোগ বঞ্চিত কর্মকর্তাদের।
এদিকে জনপ্রশাসন থেকে বিদেশে কর্মকর্তা পদায়নে মৌখিক পরীক্ষার আগেই প্রার্থীর বিভাগীয় মামলা, দুদক ও গোয়েন্দা সম্পর্কিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে চিঠি দেওয়া হলেও তা আমলে নেওয়া হচ্ছে না। ফলে সুবিধাভোগীদের পদায়ন বন্ধ করতে পারছে না সরকার। তবে আগামীতে বিদেশি দূতাবাসে কর্মকর্তা নিয়োগে সতর্কতা অবলম্বন করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়।
এ প্রসঙ্গে বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের সভাপতি এবিএম আব্দুস সাত্তার বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে চিঠি দিয়ে অবগত করেছিলাম। সেখানে বলেছি, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাস ও মিশনে যে কর্মকর্তা রয়েছে, তারা সবাই হাসিনা সরকারের সুবিধাভোগী। এই কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করতে হবে। তা না হলে বিদেশে গেলে সমস্যায় পড়তে পারে। তারপরও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি। জাতিসংঘে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রেষণ-১ শাখা থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) যুগ্ম সচিব থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলিপূর্বক নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাদের চাকরি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে।
এই কর্মকর্তারা হলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. সিদ্দিকুর রহমানকে মালয়েশিয়ায় কুয়ালালামপুর বাংলাদেশ হাইকমিশনে মিনিস্টার (শ্রম), পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের যুগ্ম প্রধান (যুগ্ম সচিব) জুবাইদা মান্নানকে ওমানের মাস্কাটে বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (শ্রম), প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মাহমুদুর রহমানকে সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (শ্রম), পরিকল্পনা কমিশনের উপপ্রধান (উপসচিব) এস. এম. সাইফুর রহমানকে কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সিলর (শ্রম), পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মেহরুবা ইসলামকে ইতালির মিলানে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের প্রথম সচিব (শ্রম), সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফারজানা আক্তার মিতাকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম), নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল হাসানকে সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের প্রথম সচিব (শ্রম) করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) আরিফ ফয়সাল খানকে আবুধাবির সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম), পরিকল্পনা কমিশনের সিনিয়র সহকারী প্রধান ফারাহ তানজিলা মতিনকে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম), রাজশাহীর আঞ্চলিক লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক নুর আহমেদ মাছুমকে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম), সাতক্ষীরা সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শোয়াইব আহমেদকে কাতারের দোহায় বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম), স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মার্জিয়া সুলতানাকে গ্রিসের এথেন্সে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রথম সচিব (শ্রম) করা হয়। এ ছাড়া গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিটের (প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়) উপপরিচালক জহির ইমামকে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম), জ্বালানি উপদেষ্টার সহকারী একান্ত সচিব মাহিদ-আল হাসানকে স্পেনের মাদ্রিদে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম), ভোলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. বেলাল হোসেনকে মিসরের কায়রোয় বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রথম সচিব (শ্রম), নোয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ইসমাঈলকে রাশিয়ার মস্কোতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রথম সচিব (শ্রম) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের উপপরিচালক এএইচ ইরফান উদ্দিন আহমেদকে রোমানিয়ার বুখারেস্টে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রথম সচিব (শ্রম) করা হয়। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে অধিকাংশই আওয়ামী সুবিধাভোগী।
প্রথম সচিব (শ্রম) বাংলাদেশ হাইকমিশন, বুখারেস্ট, রোমানিয়ায় পদায়ন করা হয় এএইচ ইরফান উদ্দিন আহমেদকে। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৩৩ ব্যাচের এই কর্মকর্তার বাবার নাম হারিছ উদ্দিন আহমেদ। গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগ ও পরবর্তীতে যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন হারিছ উদ্দিন আহমেদ। এরপর আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য এবং গাজীপুর আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে তিনি মারা গেলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন। এই কর্মকর্তার বাবার আওয়ামী রাজনীতিতে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার থাকলেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তা গোপন করা হয়।
বেলাল হোসেনকে পদায়ন করা হয়েছে বাংলাদেশ হাইকমিশন মিসরের কায়রোর প্রথম সচিব (শ্রম) হিসেবে। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৩৪তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা যোগদানের পরই ছাত্রলীগের সুপারিশে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে পদায়ন নেন। এরপর সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে নরসিংদীর বেলাব উপজেলায় এবং নরসিংদী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে ভোলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে বদলি করা হয়। এই কর্মকর্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত এবং ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানীর নিকটাত্মীয় হওয়ার পরও তার কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
পরিকল্পনা কমিশনের যুগ্ম সচিব মিজ জুবাইদা মান্নান। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২১ ব্যাচের এই কর্মকর্তা মিনিস্টার (শ্রম) বাংলাদেশ দূতাবাস, মাস্কাট, ওমানে পদায়ন পেয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জননিরাপত্তা বিভাগে প্রায় তিন বছর কাজ করেছেন। এর আগে ছয় বছর মিসরের কায়রো দূতাবাসের প্রথম সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। এর আগে তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরা, এডিসি নারায়ণগঞ্জ হিসেবে কাজ করেছেন।
এর আগেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইউরোপের একটি দেশে যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ জহিরুল কাইয়ুম কনসাল জেনারেল থাকা সত্ত্বেও জেনেভায় ইকোনমিক মিনিস্টার পদে নিয়োগ পেয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থায় গত ১৬ বছরে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নিয়োগ দিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পরও সাবেক ছাত্রলীগের সেই নেতাকর্মীরা রয়েছেন বহাল। এমনকি প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর জায়গায়ও আগের কর্মকর্তারাই দায়িত্ব পালন করছেন। এসব কর্মকর্তাই পদোন্নতি-পদায়নের গোপনীয় প্রতিবেদন তৈরিতে যুক্ত থাকছেন। ফলে তারা আওয়ামী কর্মকর্তাদের রক্ষা ও দলনিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা বলে প্রতিবেদন দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।