শাহরিয়ার জামান দীপ ও নেত্রকোণা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৮:৩৯ এএম
তথ্য গোপনের কারণে ফায়ার ফাইটারদের প্রাণ যাচ্ছে বলে দাবি করেছে ফায়ার সার্ভিস। সংস্থাটির দাবি, কিছু দাহ্য পদার্থ আছে, যা পানিতে আরও তীব্র হয়। আর এ সম্পর্কে দুর্ঘটনাকবলিত প্রতিষ্ঠান আগাম তথ্য দিয়ে সহায়তা না করার কারণে বারবার এমন ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ সোমবার টঙ্গীর একটি কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। কিন্তু শুরুতেই সেখানে কেমিক্যাল থাকার বিষয়টি গোপন করা হয়। এতেই হতাহতের ঘটনা ঘটে। এর আগে চট্টগ্রামের বিএম কন্টেইনার ডিপোতেও একই ঘটনা ঘটেছিল। এ কারণে আগুনের পরপরই তথ্য গোপন না করার অনুরোধ জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল।
সকাল কিংবা রাত, যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় আগুন লাগলেই সবার আগে ডাক পড়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের। কোনো কিছু চিন্তা না করে জীবন বাজি রেখে আগুন নেভাতে নেমে পড়েন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। কিন্তু কিছু কিছু সময় আগুনের কাছেই বিলিয়ে দিয়ে আসতে হয় নিজের জীবন।
গত সোমবার টঙ্গীর একটি কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সেই বিস্ফোরণের ঘটনায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারজন কর্মী দগ্ধ হন। এদের মধ্যে শামীম আহমেদ নামে একজন গতকাল মঙ্গলবার বিকালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার শরীরের ১০০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। এ ঘটনায় দগ্ধ আরও তিনজন চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ১০ বছরে আগুন নেভাতে গিয়ে মারা গেছেন ২৪ জন। এ সময় আহত হয়েছেন ৩৮৬ জন। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ১ জন, ২০১৭ সালে ২ জন, ২০১৯ সালে ১ জন, ২০২০ সালে ১ জন, ২০২১ সালে ২ জন, ২০২২ সালে ১৩ জন, ২০২৩ সালে ১ জন, ২০২৪ সাল ২ জন, সবশেষ ২০২৫ সালে ১ জন আগুন নেভাতে গিয়ে মারা গেছেন।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে সীতাকুণ্ডে লাগা আগুনে। ২০২২ সালের ৪ জুনের ওই ঘটনায় ১৩ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মী নিহত হন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর একসঙ্গে এত ফায়ার সার্ভিস কর্মীর নিহতের ঘটনা ঘটেনি। সেখানেও তথ্য গোপন করা হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পানি ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি কন্টেইনার বিস্ফোরিত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে যান ১৩ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় আগুন নেভাতে যাওয়ার আগে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার কারণে প্রাণ হারান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। যেমনটি ঘটেছিল চট্রগ্রামে, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো টঙ্গীতে। টঙ্গীর ফেমাস কেমিক্যালের ফায়ার লাইসেন্স এবং পরিবেশের ছাড়পত্র কোনোটিই ছিল না। চলছিল অবৈধভাবে। অগ্নিনির্বাপণের সময় মালিকপক্ষের কেউ ছিল না। যার কারণে ভেতরে কী ধরনের কেমিক্যাল ছিল, ফায়ার কর্মীদের সে সম্পর্কে ধারণা ছিল না। পরবর্তীতে দেখা গেছে গোডাউনটিতে সোডিয়াম জাতীয় দ্রব্য ছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন আগুন নেভাতে গিয়েছিলেন তখনই কেমিক্যালের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আহত হন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, একজন ফায়ার ফাইটার সব সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে। কিন্তু বেশিরভাগ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেখা যায় ফায়ার সার্ভিসকে সঠিক তথ্য দেওয়া হয় না, যার কারণে তাদের বিপদে পড়তে হয়।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে অধিদপ্তর কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
নিহত ফায়ার ফাইটার শামীম আহমেদের বাড়িতে শোকের মাতম
টঙ্গীতে কেমিক্যাল কারখানার আগুন নেভাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ফায়ার ফাইটার শামীম আহমেদের গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের একমাত্র নির্ভরশীল ব্যক্তিকে হারিয়ে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন বৃদ্ধ মা, একমাত্র বোন ও বড় ভাইয়েরা। তাদের আহাজারি দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না এলাকাবাসীও।
নিহত শামীম আহমেদ নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার মাসকা ইউনিয়নের পিজাহাতী (বড়বাড়ি) গ্রামের মৃত আব্দুল হামিদের ছেলে। স্ত্রী মনিরা আক্তার, শিশু ছেলে নাবিল (১১), মেয়ে হুমায়রা আক্তার (৯) ও ওহী আক্তার (৫) নামে তিন শিশুসন্তান রেখে গেছেন শামীম।
শামীম ২০০৪ সালের ১৬ আগস্ট চাকরিতে যোগ দেন। ছয় ভাই ও এক বোনের বৃহৎ পরিবারে একমাত্র শামীমই সরকারি চাকরি করতেন। অন্য ভাইয়েরা সবাই কৃষক। চাকরিতে যোগদানের দু-তিন বছর আগে শামীমের বাবা মারা যান। শামীমকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন তার পরিবারের লোকজন।
পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, কৃষক পরিবারের সন্তান শামীম ছোটবেলা থেকেই ছিলেন পরোপকারী, বন্ধুসুলভ ও বিনয়ী।
শামীমের বন্ধু মানিক মিয়া বলেন, আমরা একসঙ্গে লেখাপড়া করেছি। শামীম ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো ছিল। সব সময় মানুষের উপকারে এগিয়ে যেত। তার মৃত্যুতে আমরা যেমন শোকাহত তেমনি গর্বিতও। কারণ সে মানুষের জানমাল রক্ষা করতে গিয়ে জীবন দিয়েছে।
শামীম আহমেদের বড় ভাই সবুজ মিয়া জানান, বুধবার (আজ) সকাল সাড়ে ১০টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে শামীমের মরদেহ দাফন করা হবে।