ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:২৩ পিএম
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন দুর্যোগকালে উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। খোদ প্রকল্প পরিচালক কাজী শফিকুল আলমের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় রাষ্ট্রের ১০-১২ কোটি টাকা ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো- যে সরঞ্জাম কেনা হবে, সেগুলো দুর্যোগকালে ব্যবহার করবে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। মানহীন যন্ত্রপাতি কেনা হলে উদ্ধার অভিযানের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি ‘ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগকালে অনুসন্ধান, উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং জরুরি যোগাযোগের জন্য যন্ত্রপাতি সংগ্রহ প্রকল্প (তৃতীয় পর্যায়)’-এর আওতায় মোট ৯টি প্যাকেজে ৯টি দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ৩৪০ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে অন্তত ৪টি প্যাকেজে ‘বাংলাদেশ সায়েন্স হাউস’ নামে অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। অভিযোগ ওঠে, প্রতিষ্ঠানটি টেন্ডারের নির্ধারিত শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলেও প্রভাব খাটিয়ে কাজ বাগিয়ে নেয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ অন্য দরদাতারা প্রকল্প পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করলেও তিনি তা আমলে নেননি। ফলে ভুক্তভোগীরা বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর শরণাপন্ন হন। বিপিপিএ প্রকৌশলী শেখ নজরুল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের শক্তিশালী রিভিউ প্যানেল গঠন করে। যাচাই-বাছাই ও শুনানি শেষে দরপত্রে অনিয়মের সত্যতা পায়। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে উত্থাপন করা হয়। প্যানেল তাদের সিদ্ধান্তে তিনটি বিষয় উল্লেখ করে- বাংলাদেশ সায়েন্স হাউসের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাতিল করতে হবে; নতুন করে দরপত্র ডকুমেন্ট তৈরি করে ব্যবহারকারী সংস্থা ও টেকনিক্যাল সাব-কমিটির মতামত অন্তর্ভুক্ত করতে হবে; বিকল্প হিসেবে পিপিআর ২০০৮-এর বিধি ১২ অনুযায়ী ‘অর্পিত ক্রয়’ (ডিপিএম) প্রক্রিয়ায় দক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি কেনা যেতে পারে। এরপরও প্রকল্প পরিচালক বিপিপিএর এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেননি।
দরপত্রে অংশ নেওয়া অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগ করেছে, প্রকল্প পরিচালক ইচ্ছাকৃতভাবে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়েছেন। ফলে এক অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে অন্তত ৪টি প্যাকেজে কাজ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডোজার কেনার টেন্ডারে স্পষ্টভাবে শর্ত ছিল ‘এলিভেটেড স্প্রকেট’সহ ‘আন্ডারক্যারেজ’ থাকতে হবে। কিন্তু সেই শর্ত উপেক্ষা করে কম সক্ষমের যন্ত্রপাতি সরবরাহের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে সম্প্রতি আরও দুটি প্যাকেজে (মোট ৯২ কোটি টাকা) নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে- টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কেবল নির্দিষ্ট একটি ব্র্যান্ড ‘ক্যাটারপিলা’র সঙ্গে মিলে যায়। প্রি-টেন্ডার বৈঠকে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান লিখিতভাবে আপত্তি জানায়। তাদের বক্তব্য ছিল- শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে অন্য কোনো ব্র্যান্ড প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারে। কিন্তু প্রকল্প কর্তৃপক্ষ স্পেসিফিকেশন অপরিবর্তিত রাখে। পরবর্তীতে প্রাথমিক মূল্যায়নে সব প্রতিষ্ঠানকে ‘রেসপনসিভ’ দেখানো হলেও হঠাৎই বেশ কয়েকটি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডকে ‘নন-রেসপনসিভ’ ঘোষণা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল কেবল মনোনীত প্রতিষ্ঠানকে বিজয়ী করা। এতে সরকারের ১০-১২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সরকারি ক্রয় বিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্পে অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হলে সরঞ্জামের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা মানে মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলা। তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনী ভূমিকম্প বা দুর্যোগের সময় যে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে থাকে, তার নির্দিষ্ট মান বজায় রাখা জরুরি। সেই মান অমান্য করলে উদ্ধার কার্যক্রম চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক কাজী শফিকুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, কোনো অনিয়ম হয়নি। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ সায়েন্স হাউসের জমা দেওয়া কাগজপত্র যথাযথ ছিল। উৎপাদন সক্ষমতা সংক্রান্ত শর্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৬০টি যন্ত্রপাতি উৎপাদন ক্ষমতা কোনো দরদাতার সরাসরি নেই। তাই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে কেন বিপিপিএর রায় এখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি- এমন প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর তিনি দিতে পারেননি।
রিভিউ প্যানেলের পর্যবেক্ষণে অসঙ্গতি
বিপিপিএ গঠিত ‘রিভিউ প্যানেল-০২’ তাদের প্রতিবেদনে টেন্ডারের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরে। যেমন টেন্ডারে ‘চেইন এক্সকাভেটর’ না লিখে ‘আর্থ মুভিং ইকুইপমেন্ট’ বলা হয়েছে। বছরে ৬০টি মেশিন উৎপাদনের সক্ষমতা কোনো দরদাতা পূরণ না করলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। স্থানীয় ভাইভ স্টার সার্ভিস ওয়ার্কশপের শর্ত পূরণ হয়নি। প্রাক-দরপত্র সভায় সংশোধনের অনুরোধ এলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্যানেলের ভাষ্য, টেন্ডার ডকুমেন্ট প্রণয়ন থেকে মূল্যায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পক্ষপাতিত্বের ছাপ পাওয়া গেছে।
রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বনাম দুর্নীতির চাপ
সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। তবে এক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর। কারণ ভূমিকম্প কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগে সশস্ত্র বাহিনী যে সরঞ্জাম ব্যবহার করবে, তার মানে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। সরঞ্জাম অকেজো হলে সরাসরি জনজীবন বিপর্যস্ত হবে, প্রাণহানি বাড়বে। অভিযোগকারীদের মতে, প্রকল্প পরিচালকের কারসাজি বন্ধ না হলে শুধু দুর্নীতি নয়, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও দুর্যোগ মোকাবিলায় অক্ষমতা- দুই ধরনের ঝুঁকি একসঙ্গে তৈরি হবে।
ভুক্তভোগী দরদাতারা মনে করেন, বিপিপিএর রায় কার্যকর না হওয়া এক ধরনের দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের ক্ষেত্রে যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তই কার্যকর না হয়, তবে সাধারণ দরদাতা বা করদাতার স্বার্থ রক্ষা করবে কে?
তারা বলছেন, বিপিপিএর তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ার পরও যদি চুক্তি বাতিল না হয়, তবে তা কেবল দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে। রাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয়, দুর্যোগকালে কার্যকর ব্যবস্থা এবং সরকারের প্রতি আস্থা- সবকিছুর জন্যই এখন জরুরি হচ্ছে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।