দীপক দেব
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৮:৪০ এএম
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৩ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এবার বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভোটার তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন প্রবাসীরা। বিশ্বের ৪০টি দেশের প্রায় দেড় কোটি প্রবাসীর মধ্যে এবার ৫০ লাখ প্রবাসীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দিতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এতে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশা পূরণ হবে। পোস্টাল ব্যালটে ২০ দিন আগে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। এজন্য প্রতি ভোটের বিপরীতে খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০০ টাকা। সব মিলিয়ে প্রবাসীদের ভোটের জন্য ব্যয় হবে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
তবে ভোটের নিবন্ধনের জন্য ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ নামে যে অ্যাপ তৈরি করা হচ্ছে, তার কাজ এখনও পুরো শেষ হয়নি। অ্যাপটি উন্নয়ন প্রক্রিয়ার কাজ এখনও চলছে। এরপর শুরু হবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। যাতে কোনো ক্রটি-বিচ্যুতি পেলে তা সংশোধন করে নিবন্ধনের জন্য উদ্বোধন করা হবে। এদিকে নিবন্ধনের কাজ মধ্য অক্টোবর থেকে শুরুর যে পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিপুল কর্মযজ্ঞ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হলে প্রয়োজন যথাযথ পরিকল্পনা।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বের ৪০টি দেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) আছে বা থাকবে- এমন ৫০ লাখ প্রবাসীকে ভোটার করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ সংখ্যা অনেক বেশি হলেও ইসি মনে করছে, লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়।
গতকাল সোমবার নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পোস্টাল ব্যালট (আইটি সাপোর্টেড) নিবন্ধন ও ভোটদান প্রক্রিয়া বিষয়ক তথ্য ও নির্দেশনা প্রকাশ করেছে ইসি। যাতে অ্যাপের মাধ্যমে কীভাবে নিবন্ধন করতে হবে তার পুরো প্রক্রিয়া গ্রাফিক্সের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে প্রায় ১০টি দেশের ১৭টি দূতাবাসের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার নিবন্ধন এবং এনআইডি দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করছে ইসি। একই সঙ্গে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও শুরু করেছে সংস্থাটি। এসব কর্মসূচিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য কমিশনাররা অংশগ্রহণ করছেন।
জানা গেছে- বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ইতালি, কুয়েত, কাতার, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও কানাডায় বসবাসকারী বাংলাদেশিদের এনআইডি সেবা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া আগামী মাসে জর্ডান, মালদ্বীপ, ওমান ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এনআইডি সেবা চালুর জন্য প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ৪০টি দেশেও এ সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।
জানা গেছে, একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকারের জন্য আউট অব কান্ট্রি ভোটিং (ওসিভি) প্রজেক্ট নিয়েছে ইসি। এই প্রজেক্টের অধীনে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ তৈরির কাজ এগিয়ে চলেছে। তবে ইসির পক্ষ থেকে মধ্য অক্টোবরে নিবন্ধন শুরুর ঘোষণা দেওয়া হলেও এখনও অ্যাপ তৈরির কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
অ্যাপ তৈরির কাজ চলমান জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে দুয়েক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে অবহিত করা হবে।’
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কেএম আলী নেওয়াজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের কাজ চলছে। শেষ হওয়ার পর ট্রায়াল রান হবে। তাই ঠিক কবে নাগাদ অ্যাপ উদ্বোধন হবে বা নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হবে তা এখনই বলা সম্ভব না। তবে খুব দেরি হবে না।’
ইসি সূত্রে জানা গেছে- প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনশক্তি ব্যুরো, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি-বায়রাসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নির্বাচন কমিশন দেখেছে ৪০টি দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আধিক্য রয়েছে। এসব দেশেই প্রবাসী ভোট কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘আউট অব কান্ট্রি ভোটিংয়ের ব্যাপারে আমরা দুটো প্লাটফর্ম করছি। একটি- প্রবাসে এনআইডিধারী যেসব বাংলাদেশি আছেন, তারা নিবন্ধন করবেন। অন্যটি- দেশের অভ্যন্তরে যারা আছেন। যারা নির্বাচন কাজে জড়িত বা আইনি হেফাজতে আছেন- এই ক্যাটাগরির জন্য ইনকান্ট্রি পোস্টাল ব্যালট সিস্টেম, আমরা ইন্ট্রোডিউস করব।’
ইসি কর্মকর্তারা জানান, প্রবাসীদের মধ্যে যারা নিবন্ধন করবেন, তাদের জন্য সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় পৃথক ভোটার তালিকা হবে। তফসিল ঘোষণার পর সেই তালিকা অনুযায়ী পোস্টাল ব্যালট ছাপানো হবে। যে ব্যালটে শুধু দলগুলোর দলীয় প্রতীক থাকবে। কোনো প্রার্থীর নাম থাকবে না। কারণ প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার আগে কারও নাম ব্যালটে ছাপানো যায় না। আর প্রার্থিতা চূড়ান্তের পর ব্যালট পাঠানোর সময় কুলোবে না। আবার মামলার রায়ে কেউ প্রার্থিতা পেলেও নতুন করে ব্যালট ছাপাতে হবে। তাই প্রার্থীর নাম ব্যতীত ‘সিম্বল ব্যালট’ ছাপানো হবে। সেই ব্যালট ডাক বিভাগের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া হবে প্রবাসীর দেওয়া ঠিকানায়।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হলে অনলাইনে নিবন্ধনকারীর মোবাইলে মেসেজ দিয়ে এলাকার চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা দেখে পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকে ভোট দিতে বলা হবে। সেই মেসেজ পেয়ে প্রবাসী ভোটার তার ভোট দিয়ে ব্যালট পেপার ডাকযোগে পাঠাবেন। দেশে ভোটের তারিখের অন্তত ২০ দিন আগে একজন প্রবাসী ভোট দেবেন। এদিকে ডাক বিভাগ জানিয়েছে, সবচেয়ে দূরের দেশে একটি চিঠি পাঠাতে এবং আনতে ২৮ দিন লাগে। তাই দেশের ভোটারদের আগেই প্রবাসী ভোটাররা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে এবার প্রবাসীরা ছাড়াও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এবং আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে প্রথমবারের মতো দেশের ৭১টি কারাগারের বন্দিরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। অতীতে নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদানের সুযোগ থাকলেও প্রবাসী ভোটার ও আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য ভোটের ব্যবস্থা এবারই প্রথম।
প্রবাসী ভোট নিয়ে ইসির পরিকল্পনা
ইসির রোডম্যাপ অনুযায়ী, পোস্টাল ব্যালটে ভোটদান নিশ্চিত করতে একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করবে কমিশন। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মোবাইল অ্যাপ তৈরি ও পরীক্ষামূলকভাবে তা চালানো হবে। যেখানে প্রার্থী ও প্রতীক যুক্ত থাকবে। ১ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত অ্যাপের ট্রায়াল, নীরিক্ষা ও ত্রুটি সংশোধন চলবে। একই সঙ্গে জানুয়ারি পর্যন্ত ওসিভি ও আইসিপিভি ভোটারদের জন্য প্রচারণা ও ভোটার শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
এ ছাড়া ১ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বরের মধ্যে ব্যালট পেপার, নির্দেশিকা ও ঘোষণাপত্র মুদ্রণ হবে। নিবন্ধন শুরু হবে ১১ নভেম্বর থেকে আর চলবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। এরপর ডাক বিভাগ খাম কাস্টমাইজ করবে এবং ২০ নভেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ভোটারদের কাছে ব্যালট পেপার পাঠানো হবে। তফসিল ঘোষণার পর প্রতীক বরাদ্দ শেষ হলে ওসিভি ও আইসিপিভির আওতায় ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন। ভোট প্রদান শেষে ব্যালট পেপার দেশে ফেরত পাঠাতে হবে নির্বাচনের এক মাস আগে, পরে তা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে সিল করা অবস্থায় পাঠানো হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নির্বাচন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রবাসী ও দেশের মধ্যে পোস্টাল ব্যালট কার্যকর করতে ইসির ৮০ কর্মকর্তা কাজ করবেন। তবে পোস্টাল আসার পর তা কোথায় রাখা হবে, কার তত্ত্বাবধানে থাকবে, কার সামনে এই পোস্টাল ব্যালটগুলো খোলা হবে, কোনো প্রার্থী খুব সামান্য ভোটে হেরে পোস্টাল ব্যালটকে বিতর্কিত করতে চাইলে কমিশন কী পদক্ষেপ নেবে- এসব নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু ও ৫০ লাখ প্রবাসীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরির বিষয়টি ইসির জন্য চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিলে যথাসময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব।’
যে প্রক্রিয়াতে নিবন্ধন ও ভোট দেবেন প্রবাসীরা
প্রথমে Postal Vote BD অ্যাপ চালু করতে হবে। নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতে হবে। নিবন্ধনের সময় মোবাইলে একটি ওটিপি (OTP) যাবে, যা ইনপুট দিয়ে নম্বর যাচাই করতে হবে। লাইভ ফেস ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে স্ক্যান করে তথ্য যাচাই করতে হবে। বৈধ পাসপোর্টের কপি আপলোড করতে হবে। নিজের নাম, জন্ম তারিখ ও ঠিকানাসহ প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ করতে হবে। সব তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত করার পর আবেদন জমা হবে। আবেদন গ্রহণ হলে ইসি ডাকযোগে পোস্টাল ব্যালট পাঠাবে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, ভোটার যে ঠিকানায় নিবন্ধন করেছেন, সেই ঠিকানায় একটি খামে একটি ব্যালট এবং দুটি খাম যাবে। ভেতরে থাকা খামে আসন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার ঠিকানা থাকবে। ভোটার কলম দিয়ে নির্ধারিত উপায়ে ব্যালট পেপারে ভোট দিয়ে তা আবার রিটার্নিং কর্মকর্তার ঠিকানা লেখা খামে ভরে ডাকযোগে পাঠিয়ে দেবেন।
পোস্টাল ব্যালট পাঠানো থেকে শুরু করে ফেরত আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে সরকারি ডাক বিভাগের মাধ্যমে। পুরো প্রক্রিয়াটি প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বয়ংক্রিয়। ভোটারের আসন, রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা, প্রিন্টেড খাম- সবকিছু এনআইডি ডেটা পুলের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না। ডাক বিভাগ ব্যালট পেপার ও খাম প্রিন্টিংয়ের দায়িত্ব পালন করবে। ভোটগণনার সময় ডাকযোগে প্রাপ্ত ভোটগুলো গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।