× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জনপ্রশাসনের মোখলেসনামা

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:০৬ এএম

ইনসেটে ড. মোখলেস উর রহমান।

ইনসেটে ড. মোখলেস উর রহমান।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তিভিত্তিক সিনিয়র সচিব ড. মোখলেস উর রহমানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বহীন বিভাগ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) করা হয়েছে তাকে। এ ঘটনায় গোটা প্রশাসনে চলছে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা। তারই আমলে প্রশাসনে স্বজনপ্রীতি ও অস্থিরতা প্রকাশ্যে আসে। গতকাল রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর আগে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে এ-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ অনুমোদন দেওয়া হয়।

অভিজ্ঞজনেরা বলছেন, গত ৫৪ বছরে জনপ্রশাসন সচিবকে এমনভাবে গুরুত্বহীন বিভাগে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রায় নজিরবিহীন। এ ঘটনা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অবাক করেছে। এটি ‘টক অব দ্য প্রশাসনে’ পরিণত হয়েছে। এদিকে নতুন সচিব নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের সিপিটি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আবু শাহীন মো. আসাদুজ্জামানকে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাতিসংঘ সফর শেষে দেশে ফিরে প্রধান উপদেষ্টা নতুন জনপ্রশাসন সচিব নিয়োগ দেবেন বলে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

মোখলেস উর রহমান বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভোল পাল্টে তিনি হয়ে ওঠেন প্রভাবশালী। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর দীর্ঘদিন অবসরে থাকা প্রশাসন ক্যাডারের ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে একই বছর ২৮ আগস্ট বিগত আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে মোখলেস উর রহমানকে দুই বছরের জন্য সিনিয়র সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। জনপ্রশাসন সচিব পদে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই একের পর এক অভিযোগ ঘিরে ধরেছিল তাকে। প্রথমেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিভিন্ন ব্যাচের বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তার পদোন্নতি ও পদায়নে বৈষম্য সৃষ্টির অভিযোগ ওঠে। একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ হয়ে এককভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন। তা ছাড়া ওই রাজনৈতিক দলের অনুসারী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পদায়ন করেন তিনি। এসব ঘটনায় বিগত সরকারের আমলে বঞ্চিতরা পুনরায় বঞ্চিত হন। এরপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের করিডোরে প্রকাশ্য সমাবেশ ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। প্রশাসনে যোগ্যতা, মেধা ও অভিজ্ঞতার বদলে ঘনিষ্ঠতা এবং সুবিধাভোগী গোষ্ঠী প্রাধান্য পেয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সচিব, সংস্থাপ্রধান ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর ফলে দক্ষ ও পরিশ্রমী কর্মকর্তারা পদোন্নতির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়কে আড়াল করে নিজের ইচ্ছামতো প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে অর্থের বিনিময়ে সিদ্ধান্ত হয়েছেÑ এমন অভিযোগ অহরহ উঠলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যে কারণে তিনি অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন। তার রোষানলে পড়ে যোগ্য কর্মকর্তারা সচিব পদে পদোন্নতি পাননি। তিনি সচিব থাকাকালে জেলা প্রশাসক নিয়োগে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের ঘটনা ঘটে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়যা প্রশাসনের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এ ঘটনা তদন্তে একজন উপদেষ্টার নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়তাকে অন্য মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠলেও রহস্যজনক কারণে সেটি থেমে যায়বরং পরবর্তীতে তারই পছন্দের বিশেষ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের মাধ্যমে কমিটিকে প্রভাবিত করে প্রতিবেদন নিজের পক্ষে আনেনসেই যাত্রায় তিনি রেহাই পেয়ে যানতার আমলেই প্রশাসনে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়আন্তঃক্যাডার বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেএতে প্রশাসনে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়বিশেষত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা প্রভাবশালী হয়ে ওঠেনঅন্যদিকে ন্যায্য বঞ্চনার শিকার কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়তাদের মধ্যে জন্ম নেয় তীব্র অসন্তোষএর ফলে প্রশাসনিক সমন্বয় ভেঙে পড়ে এবং নীতিনির্ধারণে গতি শ্লথ হয়

বিষয়ে সাবেক সচিবজনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ একেএম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হলো সরকারের মেরুদণ্ডএখানে দুর্নীতি হলে গোটা প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়েমোখলেস উর রহমানের সময় স্বজনপ্রীতিআর্থিক লেনদেনের যে অভিযোগ উঠেছে, তা গোটা প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করেছেডিসি নিয়োগের সময় তার বিরুদ্ধে যখন আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল, তখনই সরকারের উচিত ছিল অন্যত্র সরিয়ে দেওয়াপ্রথমেই এমন সিদ্ধান্ত নিলে গোটা প্রশাসনে অসন্তোষ সৃষ্টি হতো না

আরেক সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আনোয়ার ফারুক বলেন, নতুন সচিব নিয়োগে যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সংকট অনেকটা কেটে যাবেতিনি বলেন, এই মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন অবসরে থাকা কর্মকর্তাকে পদায়নের আগে সরকারকে আরও ভাবা উচিত ছিলশুধু মোখলেস নন, তার সময়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা কর্মকর্তাদের ভূমিকাও এখন প্রশ্নের মুখে পড়বে

প্রশাসন-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জনপ্রশাসন সচিব মোখলেসকে অন্য মন্ত্রণালয়ে সরানো হলেও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সংকট এক দিনে কেটে যাবে নাতাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো প্রশাসনে ন্যায্যতামেধার স্বীকৃতি ফিরিয়ে আনানিয়োগপদোন্নতিতে স্বজনপ্রীতি বন্ধ করাপ্রশাসনের ভেতরে আস্থাস্থিতিশীলতা পুনঃস্থাপন করাকারণ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের গড়া প্রশাসন এখনও বহাল রয়েছেতারা প্রশাসনে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা কৌশল করছেন

তাদের মতে, মেধা, সততাদক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়ে সচিব নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হলে জনপ্রশাসন আবার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেতবে মোখলেস বিদায় নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবেতাই নতুন সচিবের ওপরই নির্ভর করছে গোটা প্রশাসনের ভবিষ্যৎ।

বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের সভাপতি ও সাবেক সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অনেক আগেই তাদের পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ কয়েকজন সচিবের চুক্তি বাতিলের জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়েছিলেন। দেরিতে হলেও সরকার পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে অভিনন্দন। তবে অন্য যেসব সচিবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা