এসডোর গবেষণা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৯:২৯ পিএম
আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৯:৩৪ পিএম
প্রতীকী ছবি
দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া চা পাতা ও টি-ব্যাগে ‘বিপজ্জনক ভারী ধাতুর’ উপস্থিতির কথা জানিয়েছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)।
তাদের দাবি, পরীক্ষায় টি-ব্যাগের প্যাকেজিংয়ে সীসা, পারদ, ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়া টি-ব্যাগ থেকে চা পাতা আলাদা করার পর ভারী ধাতু অ্যান্টিমনি, পাশাপাশি ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম শনাক্ত হয়েছে।
তবে ইতিবাচকভাবে, চা পাতার পরীক্ষায় আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, কপার, জিঙ্ক এবং কোবাল্টের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানও পাওয়া গেছে; যা সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে এসডো।
বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় এসডো প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
এসডোর প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ‘ব্রিউইং টক্সিনস: এক্সপোসিং দ্য হেভি মেটাল হ্যাজার্ড ইন টি-ব্যাগস অ্যান্ড ড্রাইড লুজ টি’ শীর্ষক এ গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। এসডো ও থাইল্যান্ড ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থ্যা ব্যান টক্সিকস যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে।
এসডো জানায়, গবেষণায় বাজার থেকে মোট ১৩টি নমুনা সংগ্রহ করে এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স (এক্সআরএফ) পরীক্ষা পদ্ধতি ব্যবহার করে বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে ১২টি টি-ব্যাগ ও একটি নমুনা খোলা চা-পাতা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, টি-ব্যাগ থেকে চা পাতা আলাদা করার পর ১২টি নমুনার মধ্যে ৪টিতে ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি মিলেছে। এর মধ্যে তিনটিতে ৪ পিপিএম, একটিতে ৩ পিপিএম ইউরেনিয়াম পাওয়া গেছে। ইউরেনিয়াম একটি তেজস্ক্রিয় পরমানু, যা পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। পরমানবিক বোমা তৈরিতেও ব্যবহার করা হয় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম।
আরেক তেজস্ক্রিয় পদার্থ থোরিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে সবগুলো নমুনাতেই।
টি-ব্যাগে সর্বোচ্চ ৫ পিপিএম নিরাপদ মাত্রা বিবেচনা করা হলেও ৬টি নমুনায় ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে ৩৩০ থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার ৬৯০ পিপিএম।
মাত্রাতিরিক্ত সীসার উপস্থিতি মিলেছে ৪টি টি-ব্যাগে। নিরাপদ মাত্রা ৫ পিপিএম হলেও পরীক্ষায় এসব টি-ব্যাগে ১৮ থেকে ৫১ পিপিএম সীসা পাওয়া যায়।
পারদ পাওয়া গেছে ৮টি টি-ব্যাগে। সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা শূন্য দশমিক ৩ পিপিএম হলেও এসব নমুনাতে ১৭ থেকে ১০৮ পিপিএম পারদ শনাক্ত হয়েছে।
আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা ২পিপিএম। ৭টি ব্যান্ডের টি-ব্যাগে সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৫টিতে সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এসব নমুনাতে সর্বোচ্চ ১৪ পিপিএম পর্যন্ত সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সীসা ও পারদের মতো ভারী ধাতু মস্তিস্কে ক্ষতি, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, আচরণগত সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক ও পারদ উচ্চ রক্তচাপ, রক্তনালীর ক্ষতি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব ধাতু প্রজননগত সমস্যা, বন্ধ্যাত্ব, গর্ভপাত ও জন্মগত ত্রুটির এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
এসডো’র সিনিয়র টেকনিক্যাল এডভাইজার ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে চা পাতায়। আর অন্যান্য ভারী ধাতুগুলো টি-ব্যাগে পাওয়া গেছে। আমাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিলো টি ব্যাগ প্যাকেজিং নিয়ে জানা। তাই বিশেষ করে ব্যাগের ওপর জোর দিয়ে গবেষণাটি করা হয়।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘টি-ব্যাগে এসব ধাতুর নিরাপদ মানমাত্রা বিভিন্ন সোর্স থেকে নেওয়া হয়েছে।’
প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এসডো’র চেয়্যারম্যান মারগুব মোরশেদ বলেন, ‘এটি ভোক্তা অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। আমরা অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাই।’
বাংলাদেশ চা বোর্ডের গবেষণা কর্মকর্তা মো. নাজমুল আলম বলেন, ‘গবেষণাটি আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা আগে জানতাম না যে টি-ব্যাগের প্যাকেজিংয়ে ভারী ধাতু থাকে। গবেষণায় সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ও চা কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করলে আরো ভালো হতো। চা-শিল্পের স্বার্থে ভবিষ্যতে আরো বড় আকারে সব পক্ষের অংশগ্রহণমূলক গবেষণা জরুরি।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মারুফ মোহায়মেন বলেন, ‘ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম পারমানবিক তেজস্ক্রিয় পদার্থ। এগুলো শুধু শরীরেরই ক্ষতি করে না বরং বহু বছর ধরে পরিবেশে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে থাকে। মাটি থেকে অথবা পানি থেকে এসব উপদান চা পাতাতে আসতে পারে। তবে এক্ষেত্রে কীভাবে এসেছে তা নিশ্চিত না হয়ে বলা যাচ্ছে না।’
এসডোর পক্ষে গবেষণাটি উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির রিসার্চ ও পলিসি এসোসিয়েট ড. ফইজুন নাহার। পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ব্র্যান্ডের ৫টি করে নমুনা নিয়ে প্রতিটিকে ৩বার করে পরীক্ষা করা হয়। পরে পৃথক ৩টি পরীক্ষার গড় করে ফলাফল প্রকাশ করা হয়।’
গবেষণায় জনসচেতনতা ও চা-পানকারীদের সংখ্যা জানার জন্য ৮ বিভাগের তিন হাজার ৫৭১ জনের উপর একটি জড়িপ পরিচালনা করা হয়। এতে দেখা যায়, ৯৬ শতাংশ মানুষ নিয়মিত চা-পান করেন, ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা দিনে দুই থেকে তিন কাপ, ২৭ শতাংশ উত্তারদাতা চার বা তার অধিক কাপ চা পান করে থাকেন। উত্তরদাতাদের মধ্যে ৯২ শতাংশ কখনো টি-ব্যাগের গায়ে লেখা লেবেল পড়ে দেখেননি। মাত্র এক শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা ধারণা রাখেন যে টি-ব্যাগে ভারী ধাতু থাকতে পারে।
সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, ‘শুধু ভোক্তা নয়, উৎপাদক ও সরকারি সংস্থা সবারই সচেতন হওয়া দরকার। গবেষণার মাধ্যমে আমরা সেই কাজটিই করতে চেয়েছি। তবে এর চেয়ে বেশি নমুনা নিয়ে বড় পরিসরে গবেষণার আর্থিক সক্ষমতা তাদের নেই।’
নমুনাগুলোর মধ্যে কাজী এন্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেডের তিনটি, ট্রফিমা রিফ্রেশম্যান্টসর দুটি ব্র্যান্ড রয়েছে। একটি করে নমুনা নেওয়া হয়েছে আবুল খায়ের কনজিউমারস প্রডাক্টস লিমিটেড, টেটলী টি এস্টেট লিমিটেড, সিটি টি এস্টেড, প্যারাগন এগ্রো লিমিডেট, ইসপাহানি কমপ্লেক্স ও দ্যা কনসোলিডেটেড টি এন্ড ল্যান্ড কোম্পানির। শ্রীলংকান কোম্পানি ডিলমা সিলন টি কোম্পানির একটি নমুনা নেওয়া হয়। এছাড়া খোলা চা-পাতার সংগৃহীত নমুনাটি শ্রীলংকার ডামরো এক্সপোর্ট প্রাইভেট লিমিটেডের।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘আমাদের গবেষণার ক্ষেত্র আরো বাড়াতে হবে। আরো বড় পরিসরে আরো সূক্ষ্ম পরীক্ষা করতে হবে।’
গবেষণা প্রতিবেদন প্রকশ অনুষ্ঠানে বিএসটিআইর সহকারী পরিচালক ইসমাত জাহান বলেন, ‘বিভিন্ন পন্যের স্ট্যান্ডার্ড তৈরির জন্য আমাদের কমিটি রয়েছে। আমরা এ ফলাফল নিয়ে সেই কমিটিতে উপস্থাপন করব, যা মানদণ্ড তৈরিতে সহায়তা করবে।’
অনুষ্ঠানে উৎপাদন থেকে চায়ের কাপে আসা পর্যন্ত নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু; চা বাগানের মাটির মান সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা; চা পানে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পানীয়ের মানদণ্ড প্রয়োগ ও আন্তর্জাতিকভাবে মানদণ্ড একীভূত করা, এবং নিরাপদ উপরকণ দিয়ে তৈরি চা পাতা ব্যবহারের অভ্যাস করার সুপারিশ করা হয়।