মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:২০ এএম
খুলনা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. সেলিম রেজাকে ৯ মাসের মাথায় বদলি করা হয়েছে। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৭তম ব্যাচের এই উপসচিবের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগও ওঠেনি। বরং জেলা পরিষদে যোগদানের পর প্রশাসনিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। তবে হঠাৎ করেই গত ২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে তাকে আগের কর্মস্থল ঝিনাইদহ জেলা পরিষদে ফেরত পাঠানো হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন সিন্ডিকেট-সমর্থিত এক নারী কর্মকর্তা, যার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই অনিয়মের তদন্ত চলছে। এই বদলিকে কেন্দ্র করে খুলনার প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সিইও সেলিম রেজার ৯ মাসের মাথায় বদলি দেশের আমলাতন্ত্রে দীর্ঘদিনের এক বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছেÑ সিন্ডিকেটের ইচ্ছাতেই বদলি হয়। বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা না গেলে যোগ্য কর্মকর্তারা বারবার বলি হবেন। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু প্রশাসন নয়, দেশের উন্নয়নও।
সাবেক সচিব ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ আনোয়ার ফারুক বলেন, দেশে বদলির সংস্কৃতি দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রভাবশালী মহলের হাতে বন্দি হয়ে পড়েছে। একজন কর্মকর্তাকে ৯ মাসের মধ্যে দুইবার বদলি করার যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন। বরং এ ধরনের বদলি মাঠ প্রশাসনে ভীতি সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ে সিন্ডিকেট বা গোষ্ঠীগত ক্ষমতা এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। সরকার পরিবর্তন হলেও এদের প্রভাব থাকে অটুট। ফলে যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হন, আর সুবিধা পান দুর্নীতিগ্রস্তরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, উন্নয়ন বরাদ্দ বণ্টন এখন মন্ত্রণালয়ের সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। কর্মকর্তাদের বদলি প্রক্রিয়া সেই ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
সেলিম রেজা খুলনায় দায়িত্ব নেওয়ার পর জেলা পরিষদের বিভিন্ন প্রকল্পে গতি ফিরেছিল। স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও ইউপি জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে স্বল্পসময়ে তার সমন্বয়ও ছিল ইতিবাচক। সততা ও দক্ষতার জন্য প্রশাসনের ভেতরেও তিনি প্রশংসিত ছিলেন। কিন্তু আকস্মিক তার বদলির খবরে অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। কারণ, মাত্র এক সপ্তাহ আগে তিনি তার পরিবারকে খুলনায় স্থানান্তরিত করেছেন। সরকারি বাসায় উঠে সন্তানদের স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েছেন। এরই মধ্যে আবার বদলির প্রজ্ঞাপন তাকে বিপাকে ফেলেছে। এটি কোনো সাধারণ বদলি নয়, বরং শক্তিশালী এক সিন্ডিকেটের ইচ্ছাতেই এ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার একান্ত সচিব ও দীর্ঘদিন স্থানীয় সরকার বিভাগে থাকা এক উপসচিবের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তা বদলি ও বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দ বণ্টনে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করে আসছে। এই সিন্ডিকেটের মুখ্য চরিত্র উপসচিব আকবর হোসেন, যিনি একসময় সচিবের পিএস ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সচিবের প্রভাব কাজে লাগিয়ে জেলা পরিষদগুলো থেকে আর্থিক সুবিধা নিতেন। সেই প্রভাবে এখনও কর্মকর্তা বদলি ও প্রকল্প বরাদ্দে প্রভাব খাটাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একাধিকবার তাকে বদলি করেছিল, কিন্ত উপদেষ্টার পিএসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে উপদেষ্টার মাধ্যমে বদলি বাতিল করে পুনরায় স্থানীয় সরকার বিভাগে রয়ে যান। সেই থেকে তিনি অপ্রতিরোধ্য।
তদন্তাধীন কর্মকর্তাকেই দায়িত্ব
সেলিম রেজার স্থলাভিষিক্ত তাছলিমা আক্তারের বিরুদ্ধে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকেই তদন্ত চলছে। বিভাগীয় কমিশনার অফিস তার অনিয়মের প্রাথমিক অনুসন্ধানের দায়িত্বে রয়েছে। তদন্ত চলাকালে তাকেই জেলা পরিষদের সিইওর দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশ্ন উঠছেÑ মন্ত্রণালয় কি প্রভাবশালী সিন্ডেকেটের চাপে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
খুলনার রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, একজন দক্ষ ও নির্ভেজাল কর্মকর্তাকে সরিয়ে দুর্নীতির তদন্তাধীন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া সরকারের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও খুলনা-৫ আসনের দলের সংসদ সদস্য প্রার্থী অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ইতোমধ্যেই স্থানীয় সরকার সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি সেলিম রেজার বদলিকে অন্যায় ও অবিচার বলে আখ্যা দিয়ে প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবি তুলেছেন। তার মতে, গত ৯ মাসে সেলিম রেজার নেতৃত্বে ডুমুরিয়া ও ফুলতলায় বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্প জমা হয়েছে। এই বদলির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধাক্কা খাবে।