এডিবির প্রতিবেদন
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ গত দেড় দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিক থেকে ধাপে ধাপে এগিয়েছে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তার সঙ্গে বেড়েছে মাথাপিছু জিডিপিও। ২০১০ সালে একজন বাংলাদেশির গড় মাথাপিছু জিডিপি ছিল মাত্র ৮৮২ ডলার। ২০২৪ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬২৫ ডলারে। প্রবৃদ্ধির এই হার প্রায় তিনগুণ। তবুও দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাথাপিছু জিডিপির দিক থেকে বাংলাদেশ এখনও পঞ্চম স্থানে। বাংলাদেশের নিচে রয়েছে শুধু পাকিস্তান, নেপাল ও আফগানিস্তান।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে পর্যটননির্ভর অর্থনীতির মালদ্বীপ। দেশটির নাগরিকদের মাথাপিছু জিডিপি ১১ হাজার ডলারেরও বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে শ্রীলঙ্কা, যেখানে মাথাপিছু আয় প্রায় ৪ হাজার ৫১৬ ডলার। তৃতীয় অবস্থানে ভুটান, প্রায় ৪ হাজার ডলার। ভারত চতুর্থ স্থানে ২ হাজার ৮০০ ডলার নিয়ে। এরপরই পঞ্চম স্থানে ২ হাজার ৬২৫ ডলার নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান। তালিকার একেবারে নিচে আছে পাকিস্তান ১ হাজার ৫৮২ ডলার, নেপাল ১ হাজার ৪৩৪ ডলার ও আফগানিস্তান ৪০০ ডলারের কিছু বেশি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের জিডিপির এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের উৎপাদন সক্ষমতা, শিল্পায়ন, কৃষি ও রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক আয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এরপরও মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে দেশ পিছিয়ে আছে আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায়। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো জনসংখ্যার চাপ, উচ্চ বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং উৎপাদনশীল খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়া। অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনীতি বাড়লেও সেই সুবিধা সমানভাবে মানুষের হাতে পৌঁছেনি।
মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়েও (জিএনআই) বাংলাদেশ অগ্রগতি দেখিয়েছে। এডিবির হিসাব বলছে, ২০১০ সালে বাংলাদেশের জিএনআই ছিল ৭৮০ ডলার। ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৮২০ ডলার। এই বৃদ্ধির হার প্রায় সাড়ে তিনগুণ। জিএনআই হিসাব করা হয় শুধু দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত সম্পদের মূল্য দিয়ে নয়, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সকেও যোগ করে। বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই বৃদ্ধিতে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ কারণে ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও আফগানিস্তানের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পেরেছে বাংলাদেশ। তবে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় পিছিয়ে আছে।
ডিজিটাল খাতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক দুর্বল।
এডিবির তথ্যমতে, ২০২৩ সালের হিসাবে দেশে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে মাত্র ৪৪ জন ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন। একই সময়ে ভারতে এই হার ৫৫ জন। দক্ষিণ এশিয়ার তালিকায় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান ১০০ জনে মাত্র ১৭ জন। পাকিস্তানে ১০০ জনে ২৭ জন ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তবে তালিকার শীর্ষে ভুটান, যেখানে ১০০ জনে ৮৮ জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে। এরপর মালদ্বীপে ৮৪ জন। ডিজিটাল অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, উচ্চ ব্যয়, গ্রামীণ এলাকায় দুর্বল সংযোগ এবং ডিজিটাল স্বাক্ষরতার অভাব বাংলাদেশের এ খাতকে পিছিয়ে দিয়েছে।
তবে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ২০২৩ সালের হিসাবে দেশে ১৯ কোটি ৬১ লাখ সক্রিয় মোবাইল গ্রাহক ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ভারতে ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১১৫ কোটি। পাকিস্তানে রয়েছে ১৮ কোটি ৮৪ লাখ ব্যবহারকারী। প্রতি ১০০ জনে মোবাইল ব্যবহারকারীর হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ, প্রতি ১০০ জনে ১১৪ জন সক্রিয় সিম ব্যবহার করে। শীর্ষে শ্রীলঙ্কা, যেখানে এই হার ১৪২ জন।
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক ভালো। এডিবির তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত প্রথম এবং বাংলাদেশ দ্বিতীয়। ভারতে প্রায় ৩ কোটি ৯৫ লাখ মানুষ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার করে, আর বাংলাদেশে এ সংখ্যা ১ কোটি ৩৫ লাখ। ফোরজি কভারেজেও বাংলাদেশের সাফল্য আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় মালদ্বীপে ১০০ শতাংশ জনগণ ফোরজি সেবার আওতায় রয়েছে। এরপরই বাংলাদেশ ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ এই সেবার আওতায়। ভারতের অবস্থান তৃতীয় ৯৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
এডিবির প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যাত্রা গত দেড় দশকে ইতিবাচক হলেও তা এখনও আঞ্চলিক মানদণ্ডে সীমিত। জিডিপি ও জিএনআই বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলেও প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়বৈষম্য হ্রাস, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ না ঘটলে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে না।