উপদেষ্টা পরিষদ
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৯:১৩ এএম
ফাইল ফটো
গত বছর জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, মামলার তদন্তে গতি আনা এবং সামাজিক মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে অন্তর্বর্তী সরকার। বিশেষ করে মামলার কারণে কোনো বিবাদী যদি শহীদ পরিবারকে ভয়ভীতি বা হুমকি দেয়, তাকে অবশ্যই দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে শহীদ পরিবারের দায়ের করা মামলা দ্রুত তদন্ত করে চার্জশিট দাখিল করতে হবে।
এমনকি তাদের পরিবারের কোনো আত্মীয় বা পরিবার যদি মামলা করতে সাহস না পায়, তাহলে পুলিশকেই বাদী হয়ে মামলা করতে হবে। কোনো অপরাধী যাতে বিচার থেকে রেহাই না পায়, সেজন্য সরকার এমন পদক্ষেপ নিয়েছে। জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের মামলায় অধিকতর গতি আনতেই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি। সম্প্রতি সচিবালয়ে উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয় বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, জুলাইয়ের ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়ের হয়। কিন্তু দায়ের হওয়া এসব মামলা দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে বলে অভিযোগ। এসব মামলা আটকে থাকার কারণ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত মতে, কোনো অপরাধী যাতে রেহাই না পায়, সেজন্য মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো তদন্ত কর্মকর্তার অজুহাত আমলে নেওয়া হবে না। গেজেটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৮৩৪ জন শহীদ পরিবারের অনেকেই এখনও মামলা করেননি। এদের মধ্যেই আহত সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার, নিখোঁজ পরিবার ১১৭, মামলা দায়ের হয়েছে ৩৪৯, অভিযুক্ত আসামি প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জন, চার্জশিট সম্পন্ন হয়েছে ৬৭ মামলার, বিচারাধীন মামলা ২৮২। তবে এখনও ২০০ বেশি মামলা হয়নি। তাদের অধিকাংশের পরিবার এখনও বিচার, নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায়। যদি কোনো আত্মীয় বা পরিবার মামলা করতে না চান, তাহলে পুলিশের পক্ষ থেকে বাদী হয়ে মামলা করার জন্য পুলিশ অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে আরও বলা হয়Ñ শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। শুধু তাই নয়, দুই সপ্তাহ অন্তর পুলিশ কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মামলার অগ্রগতি জানাবেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় দায়েরকৃত অন্যান্য মামলা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। কাউকে যেন মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা না হয়, সে বিষয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে হবে।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো ঐতিহাসিক ঘটনার বিচার দীর্ঘসূত্রতায় পড়লে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। অন্তর্বর্তী সরকার এবার সেই পথ রুদ্ধ করতে চায়।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গণমাধ্যমকে স্পষ্টতই বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার শহীদ পরিবারের মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে চায়। তবে তদন্তের প্রতিটি ধাপ নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হবে। প্রয়োজনে পুলিশ নিজেরাই বাদী হয়ে মামলা করবে। কেউ যদি সামাজিক মাধ্যমে ভয়ভীতি বা হুমকি দেয়, তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। শহীদ পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব সবাই পালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন আমাদের জাতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই অধ্যায়কে কলঙ্কিত হতে দেওয়া হবে না।
মানবাধিকারকর্মী গোলাম কিবরিয়া বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে ভিন্নমত দমন করার অভিযোগ উঠলে সেটি হবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। তাই সরকারের বর্তমান সঠিক উদ্যোগ যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সেক্ষেত্রেও যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে অনেক সময় পরিবারগুলো ভয়ভীতি বা সামাজিক চাপের কারণে মামলা করতে সাহস পায় না। পুলিশ যদি বাদী হয়ে মামলা নেয়, তাহলে বিচার প্রক্রিয়া অন্তত শুরু হবে। সরকারের এই উদ্যোগ যদি বাস্তবে কার্যকর হয়, তবে অন্তত কিছুটা হলেও শহীদ পরিবার সান্ত্বনা পাবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর ইসলাম বলেন, বর্তমানে ফেসবুক, ইউটিউব, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এগুলো শনাক্তে সাইবার ইউনিটকে আরও সক্রিয় হতে হবে। রাজনীতি বিশ্লেষক ড. হাফিজুর রহমান মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন হলে পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের একটি পর্যায়ে এগোবে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ে পুলিশের আন্তরিকতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
তবে কতিপয় বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, যদি তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার চাপে প্রমাণ সংগ্রহে ঘাটতি থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আদালতে মামলা টিকবে না। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার গাজী সিরাজুল ইসলাম বলেন, চার্জশিট দ্রুত দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি নির্ভুলভাবে প্রমাণ উপস্থাপন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নয়তো আসামিরা খালাস পেয়ে যাবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শহীদ পরিবারের সদস্য বলেন, শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এই সিদ্ধান্তগুলো শুধু পরিবারগুলোর জন্য নয়, পুরো জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে নতুন করে সহিংসতার ঝুঁকি থেকেই যাবে।