সাখাওয়াত হোসেন
প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২৩:২২ পিএম
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত ও চাকরিচ্যুত হয়েও প্রভাবশালীদের রোষানল থেকে রক্ষা পাননি গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার ডিআইজি ড. মো. নাজমুল করিম খান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তিন জন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের টার্গেটে পড়ে গত সোমবার তিনি গাজীপুরের পুলিশ কমিশনার পদ থেকে ক্লোজ হন। এর বাইরে তার ক্লোজ হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে বিএনপির রাজনীতিকে সমর্থন করার অভিযোগ।
ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও কর্মজীবনে পেশাদার, সৎ, যোগ্য ও সাহসী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের মেধাবী এই কর্মকর্তা। গত সোমবার ১ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরের এক আদেশে তাকে সদর দপ্তরে রিপোর্ট করতে বলা হয়। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ সালে তাকে জোরপূর্বক অবসরে পাঠানো হয়। পরে ২৮ আগস্ট ২০২৪ সালে তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল হন। ১২ নভেম্বর ২০২৪ সালে জিএমপি কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান ড. মো. নাজমুল করিম খান। চলতি বছরের ১ মে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, যদিও সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে গাজীপুরের পুলিশ কমিশনারকে ক্লোজ করেছে সদর দপ্তর, তবুও এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কমিশনার ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনাররা ঢাকার বাসায় থেকে অফিস করতেন। ড. নাজমুল করিম খানও সেই নিয়মেই যাতায়াত করেছেন। পূর্ববর্তী কমিশনার ও কর্মকর্তারাও একইভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু এতদিন এ নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ হয়নি বা সদর দপ্তর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। গাজীপুরের দূরত্ব ঢাকার সঙ্গে খুব বেশি নয়। তাহলে যোগদানের নয় মাস পর হঠাৎ বিষয়টি সামনে আসা তদন্তসাপেক্ষ।
সরকারি বাসা বরাদ্দ না থাকায় একজন পুলিশ কমিশনারের জন্য ব্যক্তিগতভাবে বাসা ভাড়া করে পরিবারসহ থাকার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি ছিল। কর্মকর্তারা আরও জানান, দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি মব বন্ধ করা, নানা অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, যানজট নিরসন, বিশ্ব ইজতেমার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং গার্মেন্টস সেক্টরের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে প্রভাবশালী একাধিক গ্রুপ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। এ কারণেই তাকে সরাতে নানা কৌশল নেয়া হয় এবং তার বক্তব্যসহ বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশের প্রেক্ষিতে তাকে ক্লোজ করা হয়েছে। এতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তারা আরও বলেন, দেশের সব মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের নিজস্ব সরকারি বাসভবন থাকলেও জিএমপি কমিশনারের জন্য কোনো আবাসন সুবিধা নেই। এ কারণে ঢাকায় থাকার বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তরও সচেতনভাবেই এড়িয়ে গিয়েছে।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জিএমপি কমিশনার হিসেবে যোগদানের পর বিশ্ব ইজতেমা সফলভাবে সম্পন্ন করেন ড. নাজমুল করিম খান। তার নেতৃত্বে ছয় মাসে দুই হাজার ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার, হোটেলভিত্তিক অবৈধ ব্যবসা বন্ধ, জুয়া প্রতিরোধ, পোশাক খাতে অস্থিরতা মোকাবেলা, অবৈধ মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেন। সম্প্রতি আলোচিত সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যা মামলায় তার নেতৃত্বে মাত্র তিন দিনের মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নয়জন হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। দ্রুত অপরাধী আইনের আওতায় আসায় সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ও স্বস্তি তৈরি হয়।
এছাড়া গাছা থানার অভিযানে দুর্ধর্ষ ডাকাতচক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে নগদ অর্থ, দেশীয় অস্ত্র ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। আলোচিত হানিট্র্যাপ কেলেঙ্কারিতে আহত বাদশা মিয়ার মামলার আসামিদেরও গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ট্রাভেল ব্যাগে আট টুকরো লাশ উদ্ধারের রহস্যও তার নেতৃত্বে উদ্ঘাটন হয়। এসব ঘটনায় তার কঠোর অবস্থান জনমনে স্বস্তি আনে।
সূত্র জানিয়েছে, ড. নাজমুল করিম খান বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা। তিনি জাপান থেকে কৃষিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। পুলিশের সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে বিশেষ পুলিশ সুপার থাকাকালীন ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ সালে তৎকালীন সরকার তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। তবে আদালতের লড়াই ও অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে তিনি চাকরিতে ফিরে আসেন। পরে ডিআইজি পদে পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ স্টাফ কলেজে যোগ দেন। সেখান থেকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি।
সোমবার আইজিপি বাহারুল আলম স্বাক্ষরিত আদেশে নাজমুল করিমকে দায়িত্ব হস্তান্তর করে ২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবারের মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে রিপোর্ট করতে বলা হয়। আদেশে উল্লেখ করা হয়, গাজীপুরের পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে নির্ধারিত সময়ে সদর দপ্তরে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হলো।