× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সংস্কার কমিশনের সুপারিশ

বিভাগগুলোতে হাইকোর্ট বেঞ্চ হবে কি

মাসুদুল হাসান

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৫ ০৯:১৭ এএম

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৫ ০৯:১৯ এএম

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

বিচার বিভাগ সংস্কারের গঠিত সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বিভাগীয় শহরগুলোতে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ গঠনের প্রস্তাবনা রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঐকমত্য কমিশন ২৮টি সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে উচ্চ আদালতের বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হলে বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতের আইনজীবীদের মধ্যে নানামুখী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবের পক্ষে মতামত দিলেও আইনজীবীদের একটি প্রভাবশালী পক্ষ এ নিয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। ইতোমধ্যে বিষয়টির বিরোধিতা করে উচ্চ আদালতের আইনজীবীদের একটি অংশ কোর্ট প্রাঙ্গণে বিক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট স্থানান্তর না করতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা থাকলেও তা না মেনে এমন প্রস্তাবনা দিয়েছে সংস্কার কমিশন, যা আদালত অবমাননার শামিলবিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থানান্তর হলে ন্যায়বিচার বিচ্যুত হবে, রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে, বিচারব্যবস্থা দুর্বল হবে। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে মেধাবী আইনজীবীদের সংকটও রয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলেও মনে করছেন বিরোধীতাকারীরা। অন্যদিকে আইনজীবীদের অন্য আরেকটি পক্ষ মনে করছেন উচ্চ আদালতের বিকেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়ে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও মামলাজট কমবে।

প্রয়াত সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অভিপ্রায়ে জাতীয় ঐকমত্য ছাড়াই ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন করতে সংবিধানে অষ্টম সংশোধনী আনা হয়। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপক বিক্ষোভ-আন্দোলনের পর সেটি আইনি লড়াইয়ে গড়ায়। সুপ্রিম কোর্ট সেই মামলার রায়ে ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপনকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। সেই ঐতিহাসিক রায়ের তিন দশকেরও বেশি সময় পর আবারও এমন উদ্যোগে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান ঢাকার বেশিরভাগ আইনজীবী।

১৯৮৮ সালে সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের ৬টি বেঞ্চ বসানো হয়েছিল। পরে সেই সংশোধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ হয় হাইকোর্টে। ১৯৮৯ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ৪ সদস্যের আপিল বিভাগ ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট নেওয়ার সিদ্ধান্ত অবৈধ বলে রায় দেন। বর্তমানে হাইকোর্টের বেঞ্চ ঢাকার বাইরে

স্থাপনের বিরোধিতাকারী আইনজীবীরা মনে করছেন, ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের ন্যূনতম ৩-৪টা বেঞ্চ স্থাপনের জন্য ৬-৭ জন বিচারক নিয়োগ, সুপরিসর কোর্ট রুম ও বিচারকদের পরিবার নিয়ে বসবাসের জন্য প্রয়োজন যথাযথ আবাসন সুবিধা বর্তমানে বিভাগীয় শহরগুলোতে নেই। ফলে বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণের সুফল অধরাই থেকে যাবে। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে বেঞ্চ স্থাপন হলে কোর্টের রায়ও অমান্য করা হবে। অন্যদিকে হাইকোর্টের ব্রেঞ্চ বিভাগীয় স্থাপনের পক্ষের আইনজীবীদের অভিমত এতে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমবে। বিচারপ্রার্থীকে ঢাকায় এসে বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।

চট্টগ্রাম আদালত চতুরে বিচারপ্রার্থী সাবরিনা আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, 'হাইকোর্টে পিটিশন করতে ৫০ হাজার টাকার নিচে হয় না। সবার পক্ষে তো এত টাকা খরচ সম্ভব না। স্থানীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের বেঞ্চ চালু হলে মানুষ ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাবে।'

চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি মফিজুল হক ভূঁইয়া বলেন, 'বিচার প্রাপ্তির জন্য মানুষকে একটি শহরের ওপর নির্ভর করতে হয়, যাতে মামলার জটও বাড়ছে।'

চট্টগ্রাম জেলা দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আশরাফ হোসেন চৌধুরী রাজ্জাক বলেন, 'চট্টগ্রামের আইনজীবী ও বিচার প্রার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের ব্রেঞ্চ স্থাপন। প্রতি বিভাগেই হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপন হলে মামলাজট ও ভোগান্তি কমবে।'

আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন না জানালেও চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতি বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের ব্রেঞ্চ স্থাপনের পক্ষে জানিয়ে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হাসান আলী চৌধুরী বলেন, 'তবে বার, বেঞ্চ এবং সরকার সব পক্ষকেই লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন বেঞ্চের মানের অবনতি না ঘটে।'

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে এখন ঢাকায় যাতায়াত সহজ উল্লেখ করে ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের ব্রেঞ্চ স্থাপনের বিরোধিতা করে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, 'বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপনকে আদালত অসাংবিধানিক বলেছেন। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সংসদে আইন করা যায় না।'

ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপন জটিলতম প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'স্বল্পতম দূরত্বে কোর্ট স্থাপন করা হলে মানুষের মধ্যে আদালতমুখিতা বেড়ে যাবে, যা ইতিবাচক হবে না।'

বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান রিংকন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, 'যেহেতু বিচার সংস্কার কমিশন বিষয়টি সুপারিশ করেছে তাই এর বাস্তবায়ন ভালো ফল বয়ে আনবে এবং এটা হবে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম সাফল্য।

এমন কোনো সুপারিশ করা হয়নি যা বাস্তবায়নযোগ্য নয় উল্লেখ করে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, 'মূলত ঢাকার আইনজীবীরা ঢাকার বাইরে বেঞ্চ চাইছেন না। তারা ভাবছেন, এতে তাদের সাম্রাজ্য টিকবে না, উপার্জনে প্রভাব পড়বে এবং তাদের আধিপত্য খর্ব হবে।'

তিনি আরও বলেন, 'ঢাকার বাইরে স্থায়ী বেঞ্চ গঠন বা বিকেন্দ্রীকরণ হলে পেন্ডিং মামলার চাপ বহুলাংশে কমবে।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দীন খান এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করে বলেন, 'উচ্চ আদালত বিকেন্দ্রীকরণের নামে বিভাগীয় শহরে একটি মাত্র বেঞ্চ স্থাপনের মাধ্যমে সুফল আসবে না। একাধিক বেঞ্চ স্থাপন করা না হলে জনগণ এর সুফল পাবে না।'

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার মাইনুল করিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, 'উচ্চ আদালতের বিভাগীয় বেঞ্চ স্থাপনে জুডিসিয়াল মনোপলি দূর হবে। বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমার সঙ্গে মামলাজটও কমবে।'

তবে ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের ব্রেঞ্চের বিরোধিতা করে আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, 'এতে উচ্চ আদালতের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে এবং মামলাজট কমারও সম্ভাবনা নেই।'

এদিকে ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ এ বিষয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, 'কমিশনে যেসব সুপারিশ জমা পড়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।'

ঢাকার বাইরে উচ্চ আদালতের বেঞ্চ স্থাপন প্রসঙ্গে বলেন, 'জনগণের জন্যই সংবিধান। জনগণের সুবিধা ও স্বস্তির জন্য যেকোনো কিছু করা সম্ভব।'

এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থায় উচ্চ আদালতের বিকেন্দ্রীকরণের উদাহরণ আছে কি না জানতে চাইলে আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় উচ্চ আদালতের বিকেন্দ্রীকরণের উদাহরণ নেইযেসব দেশে শাসন ব্যবস্থা রাজ্য সরকার ব্যবস্থায় বিভাজিত, তারাই বিকেন্দ্রীভূত উচ্চ আদালত ব্যবস্থার অনুশীলন করছেআমাদের সংসদও এক কক্ষবিশিষ্ট এবং বাংলাদেশ কোনো প্রদেশে বিভক্ত নয়সুতরাং সাংবিধানিকভাবেশাসন ব্যবস্থার পদ্ধতিগত কারণে এখানে উচ্চ আদালতের বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে আইনজীবী ড. শাহদীন

মালিকও প্রায় একই রকম মতামত ব্যক্ত করেন। এদিকে নাম না প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, 'জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের অনেকেই উচ্চ আদালতের বিকেন্দ্রীকরণ ভালো চোখ দেখছেন না।'

এর সঙ্গে আইন ব্যবস্যর মনোপলির সম্পর্ক জড়িয়ে আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, 'বিষয়টির বাস্তবায়ন নির্ভর করছে আগামী সংসদের ওপর। কারণ সংবিধান সংশোধন করে এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে।'

যারা বিভাগীয় শহরে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপনবিরোধী তারা যুক্তি দিতে গিয়ে আরও বলছেন যে, বাংলাদেশ ফেডারেল নয়, বরং ইউনিটারি বা এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র। ফলে এ দেশে কোনো পৃথক হাইকোর্ট নেই বা হাইকোর্টের জন্য আলাদা কোনো চিফ জাস্টিসও নেই। এখানে রয়েছে সুপ্রিম কোর্ট এবং তার একজন প্রধান বিচারপতি। আর এই সুপ্রিম কোর্টেরই দুটি ডিভিশন ও বিভাগ হচ্ছে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ। কাজেই সুপ্রিম কোর্টের একক সত্তাধীন হাইকোর্ট বিভাগকে বেঞ্চ আকারে নানা জায়গায় ছড়িয়ে দিলে তাতে রাষ্ট্রের ইউনিটারি চরিত্র ও সুপ্রিম কোর্টের অখণ্ড একক সত্তাকে খন্ডিত করা হবে। পৃথিবীর কোনো ইউনিটারি রাষ্ট্রে এর নজির নেই বলে তারা উল্লেখ করেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা