রেডম্যাপ ঘোষণা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৫ ১০:২৬ এএম
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত রোডম্যাপে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও দেশীয় পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন চূড়ান্ত করাসহ ২৪টি কার্যাবলিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে এ রোডম্যাপ ঘোষণা করেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
তফসিল কবে ও ভোট কবে হবেÑ এই প্রশ্নের জবাবে আখতার আহমেদ বলেন, ভোটগ্রহণের ৬০ দিন আগে তফসিল দেব। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বলেছে, আগামী রমজানের আগে ভোট করার জন্য। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারি রমজান শুরু। আবার রমজান তো চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। এভাবে আপনি নির্বাচনের তারিখ বের করতে পারেন। গণপরিষদ ও গণভোটের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা জাতীয় নির্বাচনের জন্য, সংসদ নির্বাচনের বাইরে আমাদের অন্য কোনো কিছু ভাবার সুযোগ নেই।’
ইসির রোডম্যাপ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ করবে ইসি। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সুশীল সমাজ, নারী প্রতিনিধি, পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যমকর্মীসহ অংশীজনরা এই সংলাপে অংশ নেবেন। দল ও অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ শেষ হতে সময় লাগবে দেড় মাস। ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রসঙ্গে রোডম্যাপে বলা হয়েছেÑ ইতোমধ্যে দ্বিতীয় ধাপের সম্পূরক খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, যা চূড়ান্ত করা হবে ৩১ আগস্ট। আর ৩১ অক্টোবরের সম্পূরক তালিকা শেষে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে ৩০ নভেম্বর।
এ ছাড়া রোডম্যাপে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২, সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০২৫, নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা (সংশোধন), নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন-১৯৯১ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন-২০০৯ Ñ এই পাঁচটি আইনের কাজ ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করা হবে।
রোডম্যাপ অনুযায়ী, নির্বাচনে পর্যবেক্ষক নিবন্ধন ২২ অক্টোবরের মধ্যে চূড়ান্ত করে ১৫ নভেম্বর নিবন্ধন সনদ প্রদান করা হবে। বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের অনুমতি প্রদানে যাবতীয় কার্যক্রম শেষ করা হবে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে। এ ছাড়া ১৫ নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচনী তথ্য প্রচারের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়, আইসিটি মন্ত্রণালয়, টিঅ্যান্ডটি, বিটিআরসিসহ বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর কোম্পানির সঙ্গে সভা করবে ইসি।
রোডম্যাপে আরও বলা হয়, নির্বাচনী ম্যানুয়েল, নির্দেশিকা, পোস্টার ইত্যাদি মুদ্রণ শেষ করা হবে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। ২৯ আগস্ট থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণের ৪-৫ দিন আগেই নির্বাচন-সংক্রান্ত যাবতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শেষ করবে ইসি। নির্বাচনের সব ধরনের মালামাল সংগ্রহ ও বিতরণ কার্যক্রম শেষ করা হবে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে। ব্যবহার উপযোগী স্বচ্ছ ব্যালট চূড়ান্ত করা হবে ৩০ নভেম্বর মধ্যে। ১৫ নভেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাজেট চূড়ান্ত করা হবে।
এতে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুকূলে অর্থ বরাদ্দের জন্য ১৬ থেকে ২০ নভেম্বরের মধ্যে বৈঠক করা হবে। নির্বাচনের জন্য জনবল ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংক্রান্ত সব কার্যক্রম ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করতে চায় ইসি। এ ছাড়া ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল প্রস্তুত শেষ হবে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম সভা হবে ২৫ সেপ্টেম্বর। এরপর ধাপে ধাপে অন্য কার্যাবলি গ্রহণ করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নির্বাচনের জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হবে ৩১ অক্টোবর। ৩১ অক্টোবরের আইসিটি সংক্রান্ত সব কাজ শেষ করতে চায় কমিশন। এ ছাড়া ইসি সচেতনতামূলক প্রচারকাজ শেষ করতে চায় ৩০ নভেম্বরের মধ্যে।
এ ছাড়া টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা, ফলাফল কীভাব প্রকাশ ও প্রচার করা হবে, বেসরকারি ফলাফল প্রচার-সংক্রান্ত কার্যক্রম নির্ধারণের পাশাপাশি ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালটে ভোটের যাবতীয় কার্যক্রম শেষ করতে চায় ইসি।
স্বাগত জানিয়েছে বিএনপি, জামায়াত-এনসিপি অসন্তুষ্ট
নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণায় মিশ্রপ্রতিক্রিয়া জানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপি স্বাগত জানালেও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে জামায়াত ও এনসিপি। গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ কাজকে প্রাধান্য দিয়ে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।
গতকাল বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণায় আমি খুব খুশি। মানুষ এই অনিশ্চয়তা থেকে বের হয়ে আসার জন্য নির্বাচনটা চাচ্ছে ভীষণভাবে। পানের দোকানদার থেকে শুরু করে শিল্পোদ্যোক্তা পর্যন্ত সব ধরনের মানুষ নির্বাচন চাচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের সমস্যা সমাধানে নির্বাচন দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। যারা নির্বাচনে বাধা দেওয়া কিংবা বর্জনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এবারের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, মানুষ এখন নির্বাচনমুখী হচ্ছে। পুরো জাতি ভোটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন হলে দেশের অর্থনীতিতে বড় একটা পরিবর্তন আসবে।
তিনি বলেন, জনগণ জবাবদিহিতামূলক সরকার চায়। ভোটের পর অর্থনীতির পাশাপাশি উন্নয়ন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হবে। ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষকে চাকরি দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে বিএনপির। তবে সব অংশীজনের প্রস্তুতি নিতে হবে।
জামায়াতের প্রতিক্রিয়া
গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ইতোমধ্যে রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবেÑ বিষয়টি ক্লিয়ার করতে হবে। আমরা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন দেওয়ার কথা বলেছি। যারা এই পিআর সিস্টেমের বিরোধিতা করছে, তারা সেই কেন্দ্র দখল, ভোট জালিয়াতির পরিকল্পনা করছে। সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে দেশ মহাবিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, যারা পিআর চাচ্ছেন, আসেন, আলোচনা হোক। দেশের জন্য যেটা কল্যাণকর হবে, সেটাই গ্রহণ করা হবে। কিন্তু মতের সংঘর্ষ ভালো কিছু বয়ে আনে না। আমরা নির্বাচন কমিশনকে বলব, পিআর পদ্ধতিকে সামনে রেখে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করুন।
এনসিপির প্রতিক্রিয়া
জুলাই সনদ চূড়ান্ত হওয়ার আগে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করা সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল বলে মন্তব্য করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের প্রধান প্রত্যাশা ছিলÑ বিচার ও সংস্কার। সেই লক্ষ্যে গঠিত সংস্কার কমিশন তাদের কাছে জুলাই সনদের খসড়া পাঠায়। এনসিপিও সেখানে নিজেদের মতামত দিয়েছে। কিন্তু খসড়ায় সনদ বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় তারা হতাশ হয়েছেন। গতকাল রাজধানীর বাংলামোটরে দলটির অস্থায়ী কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
আরিফুল ইসলাম আদীব জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ছয়টি প্রস্তাব ঐকমত্য কমিশনে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে এনসিপি গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। অন্যান্য দলের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছেÑ গণভোট, সংবিধান সংস্কার সভা ইত্যাদি। কোন প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন হবে, তার সঙ্গে নির্বাচনী প্রস্তুতির সম্পর্ক রয়েছে।
স্বাগত জানালেন জোনায়েদ সাকি
বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনÑ এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান জাতীয় স্বার্থ বলে মন্তব্য করেছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত রোডম্যাপ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্বাচনী রোডম্যাপেরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। আমরা এই রোডম্যাপ ঘোষণাকে স্বাগত জানাই।