ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৫ ১০:৫৬ এএম
ফাইল ফটো
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুই ভাগ করে জারি করা অধ্যাদেশের সংশোধনী উপদেষ্টা পরিষদে পাস হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
চলতি বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিলুপ্ত করে দুই ভাগ করার সরকারের ঘোষণায় এনবিআরের কর্মকর্তারা নজিরবিহীন আন্দোলন করেন। সরকার রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করে। এরপর প্রশাসনিক মহলে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। বিসিএস (কর) ও বিসিএস (কাস্টমস) ক্যাডারের কর্মকর্তারা সরকারের ওই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে আন্দোলনে নামেন। তারা এনবিআরের চেয়ারম্যান পদত্যাগের দাবি তোলেন। ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন এবং সরকারি আদেশ প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটান।
সরকার তখন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের কাজে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। আন্দোলন থেকে সরে আসার পরও কিছু কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, কেউ কেউ চাকরিচ্যুত হন এবং দুদক তদন্ত শুরু করে।
এই আন্দোলন শুধু কর্মচারী অসন্তোষের বিষয়ই নয়, এটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি, শৃঙ্খলা এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। বিশেষ করে সেই অধ্যাদেশকে কেন্দ্র করে যে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছিল, সেটি এনবিআরের কাঠামো পরিবর্তনের ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল। এই অধ্যাদেশ গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন হয়েছে।
জানা যায়, এনবিআরের দুই ক্যাডার কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের মূল কারণ ছিল একটি অধ্যাদেশ। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে এনবিআর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (IRD) ভেঙে দুটি নতুন বিভাগ ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ ও রাজস্বনীতি বিভাগ’ গঠনের কথা বলা হয়।
অধ্যাদেশের ৭ (৩) ধারা অনুযায়ী, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব পদে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ‘অগ্রাধিকার’ দেওয়া হবে। তবে বিসিএস (কর) ও কাস্টমস কর্মকর্তারা চাইছিলেন, সচিব পদে নিয়োগ অবশ্যই তাদের মধ্য থেকে হোক এবং ‘অগ্রাধিকার’ শব্দটি বাতিল হোক। একইভাবে রাজস্বনীতি বিভাগের সচিব পদেও বিশেষ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রাধান্য নিশ্চিত করার দাবি ওঠে।
তারা মনে করতেন, অধ্যাদেশের এই ধারা প্রথাগত নিয়োগ পদ্ধতিকে অগ্রাহ্য করছে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের পদক্ষেপ
ঘটনার পর গত ২৯ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান হন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, (যিনি সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা)। গত ১০ আগস্ট কমিটি এনবিআর অধ্যাদেশ সংশোধনের সুপারিশ প্রেরণ করে। প্রধান সুপারিশগুলো ছিলÑ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের ‘অগ্রাধিকার’ ধারা বাতিল করা। রাজস্বনীতি বিভাগের সচিব পদে বিসিএস (কর) ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রাধান্য নিশ্চিত করা। সরকার বলেছে, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো রাজস্ব আদায়ে গতিশীলতা আনা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রাধান্য নিশ্চিত করা হলেও যদি নিয়োগ যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে না হয়, তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা থাকবে না। প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিশেষ ক্যাডারের প্রাধান্য নিশ্চিত করা প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে পারে কিন্তু স্বচ্ছতা না থাকলে দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে নিয়োগ অবশ্যই যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে হতে হবে, ক্যাডার প্রাধান্য নয়। অন্যথায় প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি আরও বলেন, কোনো একটি ক্যাডারের প্রাধান্য নিশ্চিত করলে তা স্বাভাবিকভাবে অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনিক সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়াই মূল সমাধান।
পরিসংখ্যান ও বাস্তব চিত্র বলছে, বাংলাদেশের রাজস্ব সংগ্রহ নিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশের ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত ১০%-এরও কম। গত ৫ বছরে প্রায় ৩০০ কর্মকর্তাকে শাস্তি বা অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে। এনবিআরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দুর্নীতির অভিযোগ নিয়মিত রিপোর্টে উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াবে কি না, তা বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে এমন প্রেক্ষাপটে যেখানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা জরুরি। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের পরও কর্মকর্তাদের দাবি মেনে নেওয়া এবং প্রাধান্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা অনিশ্চিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় না রেখে প্রাধান্য নিশ্চিত করা হলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাজস্ব সংগ্রহ ও প্রশাসনিক কার্যকারিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকার বলেছে, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো রাজস্ব আদায়ে গতিশীলতা আনা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কার্যকর হতে হলে নিয়োগ অবশ্যই যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। কেবল ক্যাডারের প্রাধান্য দিয়ে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। নীতি, স্বচ্ছতা এবং দক্ষতাÑ এই তিনটি উপাদান ঠিক থাকলে তবেই রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসন ক্যাডারের এক কর্মকর্তা বলেন, এনবিআর ইতিহাস প্রমাণ করেছে, স্বচ্ছতা বজায় না রেখে বিশেষ ক্যাডারের প্রাধান্য নিশ্চিত করলে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাড়তে পারে। বর্তমানে সরকারের লক্ষ্য রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং প্রশাসনিক দক্ষতা উন্নত করা। তবে বাস্তবতা হলো, প্রাধান্য নিশ্চিত করা হলেও যদি নিয়োগ যোগ্যতা এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে না হয়, তা রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে কতটা কার্যকর হবে, তা অনিশ্চিত। এই আন্দোলন এবং সংশোধিত অধ্যাদেশ প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও রাজস্ব সংগ্রহের ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ না হলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্বনীতি ও কার্যক্রম প্রভাবিত হতে পারে।