সংকটের ৮ বছর
নুপা আলম, কক্সবাজার
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৫২ এএম
রোহিঙ্গা ক্যাম্প/ ফাইল ফটো
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৭টি বড় সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় থাকার তথ্য দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই সঙ্গে আরও অন্তত ছোট ছোট সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। যাদের আধিপত্য বিস্তার ও সদস্য বাড়ানোর অপতৎপরতার বলি হচ্ছে সাধারণ রোহিঙ্গা।
২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের ভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা সংকট এখন ৮ বছরে এসে দাঁড়িয়েছে। আর এ সময়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীর আতঙ্ক। সাধারণ রোহিঙ্গারা বলছেন, দিনের বেলায়ও অস্ত্রধারীদের চোখ রাঙানি, চাঁদাবাজি ও অপহরণের ভয়ে ঘর থেকে বের হতে সাহস পান না। আর রাতের রোহিঙ্গা ক্যাম্প মানেই আতঙ্ক।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে, সীমান্তের পাহাড়ি এলাকায় ৭টি বড় ধরনের সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। এর বাইরে অন্তত ৫০টি ডাকাত গ্রুপ রয়েছে ক্যাম্পে। বর্তমানে যে ৭টি বড় সশস্ত্র সংগঠন সক্রিয়, তা হলোÑ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা, আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি বা এআরএ, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন বা আরএসও, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন অর্গানাইজেশন বা এআরএসও, আরাকান রোহিঙ্গা লিবারেশন আর্মি, কোম্পানি গ্রুপ ও ইসলামী মাহাজ। এরা নিজেদের আধিপত্য বজায় এবং অস্ত্র-মাদক নিয়ন্ত্রণ রাখতে পরস্পরের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। আর মাঝখানে পড়ে প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ শরণার্থীরা।
১০ নম্বর ক্যাম্পের ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ আবদুল গফুর বলেন, বড় যে গোষ্ঠী আছে, তাদের মধ্যে একটি অন্যটির প্রতিপক্ষ। তারা রোহিঙ্গাদের ঘরে থাকা তরুণদের নিজেদের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির প্রতিযোগিতায় রয়েছে। যদি কোনো একটি দলের সদস্য হয়ে থাকে, তাহলে অন্য গোষ্ঠীগুলোর টার্গেটে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। আর কোনো দলের সদস্য না হলে আরও বিপদ।
বড় গোষ্ঠীগুলো কেন সদস্য বাড়াতে চায়, তা পরিষ্কার না উল্লেখ্য করে এই বৃদ্ধ বলেন, কখনও আরাকানে ফিরে যুদ্ধ, আবার কখনও রোহিঙ্গা পক্ষের শক্তি বাড়ানোর কথা বলে তারা। কিন্তু মাদক কারবার, অস্ত্র বেচা-বিক্রি, চাঁদা আদায়, অপহরণ ছাড়া কোনো কিছু করতে দেখা যায় না এদের।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে (জানুয়ারি-জুন) রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১০ ধরনের অপরাধের বিপরীতে ২৩১টি মামলা হয়েছে। যেখানে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৫টি। যে মামলার বিপরীতে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা অন্তত ২০টি। সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে মাদক সংশ্লিষ্ট। মাদকের মামলা ১১০টি। একই সঙ্গে অপহরণের ১৬টি, ধর্ষণের ১২টি মামলা রয়েছে।
মূলত ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানে পালিয়ে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এরপর গত ৮ বছরে ৩ শতাধিক খুনের ঘটনায় ২৮৭টি মামলা হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) মো. জসীম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অপরাধের মূলে রয়েছে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। আধিপত্য বিস্তারে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর বাইরে মাদক কারবারে জড়িত একটি বিশাল অংশ।
অভিবাসন ও রোহিঙ্গা বিশেষজ্ঞ আসীফ মুনীর বলেন, প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত, বেকার জীবনÑ হতাশাগ্রস্ত তরুণের মগজে অপরাধ জন্ম হচ্ছে। তারা ছোট ছোট গোষ্ঠী তৈরি করে শক্তি বা ক্ষমতা প্রদর্শন করে অর্থ আয়ের দিকে যেতে আগ্রহী হচ্ছে। একই সঙ্গে বড় যে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তারাও রোহিঙ্গাদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা তরুণদের সচেতন করে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।