আজ-কালের মধ্যে মামলা
সাইফ বাবলু
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৫ ১১:৫৩ এএম
মির্জা আজম
২০০৭ সালে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে আল আকাবা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড। আমানতকারীদের কাছ থেকে নির্ধারিত অর্থ জমা নিয়ে বিনিয়োগের বিপরীতে লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা ছিল প্রতিষ্ঠানটির। যদিও কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মির্জা আজম ও তার স্বজনদের ছত্রছায়ায় এ সমিতি অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে সেই টাকায় সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৬ বছর ধরে অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা আল আকাবা সমিতির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে তল্পিতল্পা গুটিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। এর মূল হোতা মো. জাহাঙ্গীর আলম। এমডি হলেন মির্জা মাজেদ, যিনি সাবেক এমপি মির্জা আজমের চাচাত ভাই। এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন কবির। এক মাস পার হয়ে গেলেও বিনিয়োগকারীদের কেউই তাদের পুঁজি ফেরত পায়নি। তবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ইতোমধ্যে এ সমিতি ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের মধ্যে ৪০০ কোটি টাকার সম্পদ ইতোমধ্যে জব্দ করেছে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পুঁজির টাকা ফেরত পাওয়ার আশা দেখছে সংশ্লিষ্টরা।
সিআইডি জানিয়েছে, চলতি বছরের জুলাই মাসে আল আকাবাসহ অন্তত ৩৮টি সমবায় সমিতি গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। বিষয়টি টের পাওয়ার পর হাজার হাজার বিনিয়োগকারী তাদের বিনিয়োগের টাকা ফেরত পেতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। লুটের টাকার পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকা। এসব সমিতিতে কমপক্ষে ৫০ হাজারের বেশি বিনিয়োগকারী রয়েছে। তবে এর মধ্যে আল আকাবা সমিতির গ্রাহকের ৭০০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার অভিযোগ আসে। সেই অনুসন্ধানে নেমে সমিতির ৪০০ কোটি টাকার সম্পদ ঢাকা নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় খুঁজে পাওয়া যায়। ইতোমধ্যে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল মামুনের নেতৃত্বাধীন টিমের সদস্যরা এসব সম্পদ জব্দ করেছে। বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে আল আকাবার চেয়রম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলমসহ পরিচালক পর্যদের সবার বিরুদ্ধে।
সিআইডির পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর আল আকাবায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কমপক্ষে ২ শতাধিক ব্যক্তির সাক্ষ্য নিয়েছে সিআইডি। ইতোমধ্যে যেসব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে সেগুলোর দালিলিক মূল্য ৪০০ কোটি টাকা হবে বলে ধারণা সিআইডির। এসব সম্পদ সিআইডির টিম জিম্মায় নিয়েছে। ইন্সপেক্টর সায়েদুল এ প্রতারণার অভিযোগ তদন্ত করছেন। তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আল আকাবার চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আজ-কালের মধ্যে মামলা দায়ের করা হবে।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল মামুন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, প্রায় ৪০০ কোটি টাকার প্রতারণায় মানি লন্ডারিং আইনে মামলার প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ পরিদর্শক মো. ছায়েদুর রহমানের আবেদনের ভিত্তিতে জামালপুরের জ্যেষ্ঠ স্পেশাল জজ আদালত ৯ জুলাই এসব সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেন। পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন আদালত।
প্রকাশ, ২০০৭ সাল থেকে ১৬ বছরে কমপক্ষে ১২ থেকে ১৫ হাজার বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ ছিল এ সমিতিতে। কমপক্ষে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদ গড়েছেন প্রতারক চক্র। মূলত জামালপুর ৩ (মাদারগঞ্জ-মেলান্দহ) আসনের সাবেক এমপি মির্জা আজম ও তার পরিবারের সদস্যরা এ সমিতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। এ সমিতি জামালপুরের সবচেয়ে বড় সমবায় সমিতি ছিল। আরও ৩৮টি ছোট-বড় সমবায় সমিতি মাদারগঞ্জ মেলান্দহ উপজেলায় ছিল। সব সমিতি মির্জা আজমের পরিবার নিয়ন্ত্রণ করত।
সিআইডির অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ গাজীপুরে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পেয়েছেন সিআইডি। সম্পদের মধ্যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। আল আকাবার চেয়ারম্যান জামাল ও তার সহযোগীরা আয়েশি জীবন যাপন করতেন। তবে অধিকাংশ গ্রাহক তাদের বিনিয়োগের লভ্যাংশ তো দূরের কথা মূল টাকাও ফেরত পায়নি।
সিআইডি জানিয়েছে, অনসুন্ধান করে জামালপুর জেলার সদর থানাধীন গহেরপাড়া মৌজায় প্রায় ১৫ একর জমির ওপর আলফা অট্রোবিকস নামে একটি ইটভাটা, গাজীপুর দক্ষিণ সালনা মৌজায় প্রায় ৩৫০ শতাংশ জমির ওপর আলফা ড্রেসওয়ার নামে একটি গার্মেন্টস কারখানার সন্ধান পেয়েছে সিআইডি। তা ছাড়া আলফা ডেভেলপার নামে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠান, আলফা ড্রেসওয়ারের নামে বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পে ৯টি প্লটের অস্তিত্ব মিলেছে। এ ছাড়া ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর এবং জামালপুরে আরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জমিসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদ পেয়েছে। ইতোমধ্যে এসব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
সমিতির সদস্যদের টোপ দেওয়া হয় সমিতিতে বিনিয়োগ করলে দ্বিগুণ অর্থ পাওয়া যাবে। প্রতিমাসে লাখপ্রতি ১২০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা দেওয়া হবে। মূলধনের টাকা যখন চাইবেন লাভসহ ফেরত পাবেন বিনিয়োগকারীরা। শুরুর দিকে গ্রাহকদের কিছু মুনাফা দিতে শুরু করে আল আকাবার পরিচালনা পর্ষদ। এতে মানুষের মধ্যে সমিতির কার্যক্রম নিয়ে বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয় সমিতির পরিচালনা পর্ষদ। আর এ বিশ্বাস ও আস্থা কাজে লাগিয়ে কমপক্ষে কয়েক হাজার মানুষের কাছ থেকে ৭০০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেয় তারা। তবে সিআইডি এখন পর্যন্ত ৪০০ কোটি টাকার সম্পদ পেয়েছে।