পুলিশ সংস্কার: ১১ প্রস্তাবের বাস্তবায়ন হচ্ছে
তানভীর হাসান ও শাহরিয়ার জামান দীপ
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১০:৩৮ এএম
ফাইল ফটো
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগেই পুলিশ সংস্কারের ১৩ সুপারিশের ১১টি বাস্তবায়ন হচ্ছে। তবে সংস্কার কমিশনের সুপারিশের পরও এখনই বাস্তবায়ন হচ্ছে না, পুলিশ আইন ও প্রবিধানমালার পুরাতন হয়ে যাওয়া ২২টি ধারাতে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা পরিবর্তন, পুলিশের যুগোপযোগী আইন-প্রবিধানমালা ও পুলিশ সদর দপ্তরে মানবাধিকার সেল স্থাপন। এ দুটি বিষয় আগামীতে নির্বাচিত সরকারকে বাস্তবায়নের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে লিখিত আকারে অনুরোধ করা হবে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। এ দুটি বিষয় নিয়েই বরাবরই অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে।
পুলিশ সংস্কারের যে ১১টি সুপারিশ বাস্তবায়ন হচ্ছে সেগুলো হচ্ছে অবৈধ জনসমাবেশ ভঙ্গ করার জন্য ৫ ধাপে বলপ্রয়োগের রীতি, রিমান্ডে স্বচ্ছ কাচের ঘেরাটোপ দেওয়া জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ, অভিযান পরিচালনার সময় জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম ও শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরা ব্যবহার করা, রাতে গৃহ তল্লাশি করার ক্ষেত্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অথবা কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠন, ফৌজদারি মামলা তদন্তে বিশেষায়িত দল গঠন করা, থানা বা উপজেলা ভিত্তিক ওভারসাইট কমিটি গঠন করা, অনুমোদিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর মেনে চলা, বিভাগীয় শহরগুলোয় করোনার (Coroner) নিয়োগ দেওয়া (করোনার হচ্ছেন একজন সরকারি বা বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, যিনি মৃত্যুর পদ্ধতি বা কারণ সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনা বা আদেশ দেওয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত), ফরেনসিক প্রশিক্ষণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা ও ডিএনএ ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা। সম্প্রতি পুলিশ সংস্কার কমিশনের নির্দেশনা পেয়ে এরই মধ্যে আইজিপি তা বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরের বিভিন্ন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্তদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পুলিশকে জনবান্ধব করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই এসপিসহ বিভিন্ন অপারেশনাল পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। লোগো পরিবর্তন এবং পোশাকের জন্য বিভিন্ন নমুনা তৈরি করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে পোশাক ও লোগো চূড়ান্ত করার পর, উচ্চতর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়াও সংস্কার কমিশনের আরও অনেক সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্যও কাজ করছে পুলিশের আলাদা আলাদা বিভাগ। তবে ঝুলে যাওয়া দুটি বিষয়ে কথা বলতে নারাজ পুলিশের দায়িত্বশীলরা।
জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেসব প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত থাকে এদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে সাধারণভাবে অভিহিত করা হয়। প্রথাগতভাবে এই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পুলিশ বাহিনী। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পুলিশ বাহিনী এবং অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা জনমনে ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পুলিশ সংস্কারের জন্য ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’ নামে একটি কমিশন গঠন করে এবং ৯০ দিনের মধ্যে একটি প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা বরাবর প্রেরণ করার নির্দেশ দেয়। কমিশনে সাবেক ও বর্তমান আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা, আইন বিষয়ক অধ্যাপক, মানবাধিকার কর্মী এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধি রাখা হয়। সব তথ্য, উপাত্ত ও পরামর্শ যাচাই করা শেষে ইতোমধ্যে কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
ওই কমিশনের প্রতিবেদনে পুলিশ বাহিনীর সংস্কারে বেশকিছু কার্যকরী পদক্ষেপের কথা বলা হয়। এতে ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি আইন, ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন ও ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশন্সের ২২টি আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাতে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা পরিবর্তনের ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
পুলিশ সংস্কার কমিশনের আশু বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ বাস্তবায়নে চলতি বছরের ২২ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ পুলিশ সদর দপ্তরকে নির্দেশনা দিয়েছিল। সেই অনুযায়ী পুলিশ সদর দপ্তর এরই মধ্যে ৯টি বিষয়ে অভ্যন্তরীণ সংস্কারপ্রক্রিয়া চলমান।
‘বিচারপ্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত মিডিয়ার সামনে কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না’ বলে পুলিশ সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছিল। এরই মধ্যে এই সুপারিশ বাস্তবায়নে পুলিশের সব ইউনিটে নির্দেশ পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ছিল চাকরিপ্রার্থীর বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা/শিক্ষা সনদপত্র/ট্রান্সক্রিপ্ট/ মার্কশিট ইত্যাদি যাচাই-বাছাই করার দায়-দায়িত্ব নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তাবে। এগুলো পুলিশ ভেরিফিকেশনের অংশ হবে না। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে ডিএসবি ম্যানুয়াল সংশোধনের পদক্ষেপ নিয়েছে সদর দপ্তর। এ ছাড়া পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকারি চাকরির জন্য সব পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে পুলিশের সব ইউনিটকে নির্দেশনা পাঠিয়েছে সদর দপ্তর। সে অনুযায়ী পুলিশ ভেরিফিকেশন কার্যক্রম শুরুও হয়েছে।
মামলা দায়ের, রেকার বিল চার্জ করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কর্তৃক মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করে পুলিশ সংস্কার কমিশন। এ ছাড়া থানায় জিডি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে বলে। কোনোক্রমেই জিডি গ্রহণ প্রত্যাখ্যান করা যাবে না বলেও সুপারিশে উল্লেখ করা হয়। সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সব থানায় পর্যায়ক্রমে অনলাইন জিডির কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে আবেদনকারী সরাসরি না এসেও অনলাইনে জিডি করার সুযোগ থাকবে বিধায় জিডি প্রত্যাখ্যান বা জিডি করানোর বিনিময়ে অন্যায় সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়েছেন সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা। আর মামলার এফআইআর গ্রহণে ‘কোনোরূপ অনীহা বা বিলম্ব করা যাবে না’ বলে কমিশন সুপারিশ করেছিল। এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এ ছাড়া অনলাইন এফআইআর চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে অনলাইন এফআইআর চালুর জন্য প্রয়োজনীয়তা উল্লেখপূর্বক ফৌজদারি কার্যবিধিতে সংশোধনীর প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী ইতোমধ্যে এসপিসহ বিভিন্ন অপারেশনাল পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ ছাড়াও পুলিশের লোগো পরিবর্তন এবং পোশাকের জন্য বিভিন্ন নমুনা তৈরি করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে পোশাক ও লোগো চূড়ান্ত করার পর, উচ্চতর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পুলিশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই সংস্কার সম্পন্ন হবে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নানা বিষয় চাইলেই খুব সহজে সংস্কার করা সম্ভব না। পুলিশ যাতে জনবান্ধব পুলিশ হতে পারে সেই বিষয়টিকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পুলিশ সংস্কারের লক্ষ্যে দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য সিদ্ধান্তগুলো যথাযথভাবে ও বিতর্কমুক্ত থেকে প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে যে বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকা প্রয়োজন তা হলো মাঠপর্যায়ের পুলিশের সঙ্গে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সমন্বয় থাকা অপরিহার্য। চলতি সময়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ যে ধরনের নিরাপত্তা সংকটসহ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, তা নিয়ন্ত্রণে উপকরণসহ সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা। এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পুলিশের একক প্রাধান্য থাকা অপরিহার্য, যা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে।