শিক্ষা মন্ত্রণালয়
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৫ ০১:১১ এএম
সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের পরিধি বড়। বিভাগটির অধীনে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, সরকারি-বেসরকারি কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় শাখা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য কর্মকাণ্ডে মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অপরিসীম। এ ছাড়াও সরকারি কলেজগুলোতে হাজার হাজার বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডার শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন এই বিভাগেই। তাদের অনেকেই দেশের বড় বড় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদেই আছেন। তাদের সার্বিক বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে দেখভাল করতে হয়। আবার সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি এমপিওভুক্ত বেসরকারি কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীকে দেখভালও করে এ বিভাগ। শিক্ষাঙ্গনে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এসে থাকে। এটি নির্বাহী ক্ষমতাবলে মন্ত্রণালয়ের সচিবই আদেশ-নির্দেশনা জারি করে থাকেন। কিন্তু গত এক মাস ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগ সচিব ছাড়াই চলছে। সেখানে সচিবের রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কলেজ অনুবিভাগ) মো. মজিবর রহমান।
গত ২১ জুলাই রাজধানী ঢাকা উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর ছাত্রদের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে ২২ জুলাই এই বিভাগের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়েরকে প্রত্যাহার করা হয়। তারপর থেকেই পদটি শূন্য রয়েছে। সচিব না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে থাকছে। এতে মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে শিক্ষার্থী-শিক্ষক নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটির কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। করণীয় বিষয়ে রুটিন সচিবের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পাচ্ছেন না। পাশাপাশি যথাসময়ে এইচএসসি শিক্ষার্থীদের ভর্তির নতুন সিদ্ধান্ত এলে সেক্ষেত্রে করণীয় কী হবেÑ সে বিষয়েও সচিবের রুটি দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তার পক্ষে সম্ভব নয়।
সূত্রগুলো জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে দ্রুত সচিব নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর যোগ্য কর্মকর্তাদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করা হয়। এ খবর জানাজানির পর দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দেলের সমর্থক-কর্মকর্তাদের পক্ষে শুরু হয় তদবির। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঘরানা ও বিসিএস নবম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. সামসুল আলমকে চুক্তিতে সিনিয়র সচিব নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব তৈরি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সার-সংক্ষেপ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়। কিন্তু জামায়াত সমর্থক কর্মকর্তা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলামকে ওই বিভাগে সচিব হিসেবে পদায়নের জোর লবিং শুরু হয়।
জামায়াত সমর্থক শিক্ষক নেতাদের যুক্তি হচ্ছে, কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব কবিরুল ইসলাম আগেও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। সততা ও মেধার সঙ্গে সেখানে অনেক ইতিবাচক কাজ করেছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়েছিল। তাই অভিজ্ঞ হিসেবে তাকে এই বিভাগে চুক্তিভিত্তিক সচিব নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। অতিসম্প্রতি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) গেছেন। তিনি বিসিএস একাদশ ব্যাচের কর্মকর্তা।
অন্যদিকে বিএনপি সমর্থক শিক্ষক নেতারা বলছেন, বিসিএস নবম প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তা গত ১৮ বছর ধরে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। যোগ্যতা ও মেধা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক কারণে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) থাকতে হয়েছে। সুতরাং তিনিই যোগ্য বলে মনে করছেন বিএনপি সমর্থক কর্মকর্তারা।
এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দুটি দল থেকে বিভিন্ন সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে প্রভাবিত করা হচ্ছে। যে কারণে সচিব নিয়োগ দিতে পারছে না। তাই সবকিছু নির্ভর করছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর। প্রধান উপদেষ্টার চূড়ান্ত নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এই বিভাগে সচিব নিয়োগ দিতে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ এ বিভাগে সচিব নিয়োগ দেবে সরকার। কারণ এর আগেও সচিব নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক হওয়ায় সেই সমালোচনা মুক্ত হতে চাইছে সরকার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ১৭ আগস্ট বিসিএস ৮২ ব্যাচের (প্রশাসন) অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. শেখ আব্দুর রশিদকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সিনিয়র সচিব করা হয়। এরপর একই বছরের অক্টোবরে তাকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সচিব হিসেবে দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর নবম ব্যাচে অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব সিদ্দিক জোবায়েরকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। তার অধীনে ৪৭ উপাচার্যের মধ্যে ৩০ জন, এবং ৪০টির মধ্যে ১৮ জন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষক সংগঠনের সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের লবিংয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। তার চুক্তিভিত্তিক সচিব নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনে নানা সমালোচনা রয়েছে। যে কারণে সরকার চাইছে ক্লিন ইমেজের কর্মকর্তাকে এই বিভাগে সচিব নিয়োগ দিতে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাকে এই বিভাগে সচিব নিয়োগ দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তার জীবনবৃত্তান্ত সরকারের জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটির কাছে জমা হয়েছে। খুব শিগগির পর্যালোচনা করে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে সচিব নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। শুধু এক বিভাগ নয়, অন্যান্য শূন্য থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগেও নিয়োগ দেওয়া হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জোর রাজনৈতিক তদবিরের কারণে শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিব পদ শূন্য থাকলেও নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না দেওয়া হলে কোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিব নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে না। যে কারণে মন্ত্রণালয় ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করছে।