জ্বালানি খাত
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৫ ২৩:৫১ পিএম
আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৫ ২৩:৫১ পিএম
পাইপলাইনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল পরিবহনের মধ্য দিয়ে আরেকটি মাইলফলক ছুঁতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন প্রকল্পটি উদ্বোধন হতে যাচ্ছে আগামী ১৬ আগস্ট। উদ্বোধনের পর এই পাইপলাইন দিয়ে শুরু হবে বাণিজ্যিকভাবে ডিজেল পরিবহন। এর মধ্য দিয়ে দেশে জ্বালানি তেল পরিবহনে আসতে যাচ্ছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। নদী ও সড়কপথের বাইরে জ্বালানি তেল জাহাজ থেকেই পাইপলাইনে সরাসরি ঢাকায় পাঠানো যাবে।
জ্বালানি তেল নিয়ে মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে আসে জাহাজ। এরপর জাহাজ থেকে এসপিএম প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা পাইপলাইনে প্রথমে আনা হবে চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা এলাকায়। পরে সেখানে অবস্থিত পদ্মা, মেঘনা, যমুনা অয়েলের রিজার্ভ ট্যাংক থেকে পাইপলাইনে পুনরায় তেল চলে যাবে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়। এতে সময় এবং অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন চালু হলে তেল পরিবহনে বছরে সাশ্রয় হবে ৩২৬ কোটি টাকা। আর সময় বাঁচবে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা।
প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমিনুর হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গত মার্চে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর ইতোমধ্যে আমরা কয়েক দফায় ট্রায়াল রান সম্পন্ন করেছি। ১৬ আগস্ট প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। এরপর চূড়ান্ত কমিশনিংয়ের কাজ শুরু হবে। কমিশনিং শেষ হতে সময় লাগবে ৫ দিন। এরপর পাইপলাইনটি দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে তেল পরিবহন শুরু হবে। পাইপলাইনটি দিয়ে এখন শুধু ডিজেলই পরিবহন করা হবে। পরবর্তীতে চাহিদা বাড়লে অন্যান্য জ্বালানি তেলও পরিবহন করা যাবে।
সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেটা অ্যাকুইজিশন (এসক্যাডা) সিস্টেমে পাইপালাইনে তেল পরিবহন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পটি চালুর আগে এ-সংক্রান্ত যেসব মেশিনারিজ, প্রযুক্তিগত দিক আছে; সেগুলো আমরা ফাইন টিউনিং করেছি। পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি থেকে ৩৪ জন প্রকৌশলীকে নিয়োগ করা হয়েছে, প্রযুক্তিগত দিকগুলো তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে তেল পরিবহন শুরুর পর তারাই প্রকল্পটি পরিচালনা করবেন।
দেশের চাহিদার পুরো জ্বালানি তেল আমদানি হয় চট্টগ্রাম দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বড় জাহাজে করে তেল চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়। এরপর সেখান থেকে ছোট ছোট অয়েল ট্যাংকারে সেগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা ৭০ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন।
এত দিন বিপুল এই জ্বালানি তেলের অধিকাংশ নৌপথে অয়েল ট্যাংকারে আসে। বাকি তেল সড়কপথে পরিবহন করা হতো। কিন্তু বৈরী পরিবেশের কারণে বিভিন্ন সময় তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হতো। অন্যদিকে মাঝেমধ্যে অয়েল ট্যাংকার দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তেল নদীতে পড়ে পরিবেশের ক্ষতি হতো। তাই জ্বালানি তেল পরিবহন সহজ, সুষ্ঠু, নিরবচ্ছিন্ন এবং দ্রুত সময়ে পরিবহনের জন্য ২০১৬ সালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার গুপ্তখাল থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পর্যন্ত পাইপলাইনে তেল পরিবহনের উদ্যোগ নেয় বিপিসি। ওই বছর অক্টোবরে প্রকল্পটি একনেক সভায় পাস হয়। এরপর ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রকল্পটি পদ্মা অয়েল কোম্পানির তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরপর ২০১৮ সালে পদ্মা অয়েল কোম্পানির পক্ষে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ করে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ওই সময় ২০২০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সেটি সম্ভব হয়নি। পরে দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পর চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়।
প্রকল্পটির অধীনে ২৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানোর পাশাপাশি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি, মিরসরাই উপজেলার গোপীনাথপুরে একটি, চৌদ্দগ্রামের রতনদিয়া, চাঁদপুরের কচুয়া এবং মুন্সীগঞ্জের হোসেনদি এলাকায় একটি করে মোট পাঁচটি এসভি স্টেশন স্থাপন করা হয়। প্রকল্পের আওতায় একটি ডিসপাস টার্মিনাল, একটি ইন্টারমিডিয়েট পিকিং টার্মিনাল এবং একটি রিসিভ টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে। এর বাইরে কুমিল্লায় ২০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার একটি পেট্রোলিয়াম ডিপো নির্মাণ করা হয়।
৩ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার পর এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী ১৬ আগস্ট উদ্বোধনের পর প্রকল্পটির কমিশনিং কার্যক্রম পরিচালনা করবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। চূড়ান্ত কমিশনিংয়ের পর পাইপলাইনে তেল পরিবহনের বাণিজ্যিক অপারেশনের কাজ পরিচালনা করবে পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি পিএলসি।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রায়হান আহমাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ১৬ আগস্ট উদ্বোধনের পর প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেনাবাহিনী কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের অধীনে চূড়ান্ত কমিশনিং হবে। এরপরই বাণিজ্যিকভাবে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহন শুরু হবে। বাণিজ্যিকভাবে তেল পরিবহন শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা সেটি পরিচালনা করব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাইপলাইনে তেল পরিবহন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর আগে তিন দফায় প্রকল্পটির প্রি কমিশনিং হয়েছিল। সেসময় আমাদের লোকজন পরিচালনার কাজ বুঝে নিয়েছেন।