সরকার উৎখাত চক্রান্ত
শাহরিয়ার জামান দীপ
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৩৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর থেকেই একের পর এক ষড়যন্ত্র করে আসছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন। নানামুখী অপতৎপরতার মাধ্যমে সরকারকে ব্যর্থ করাই পরাজিত শক্তির মূল টার্গেট। এই পরিকল্পনা সামনে রেখে তৈরি করা হয়েছে মাস্টারপ্ল্যান। নেতাকর্মীদের দেওয়া হচ্ছে গেরিলা প্রশিক্ষণ। সেই মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে তালিকাভুক্ত হাজার হাজার নেতাকর্মী সামাজিক মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে কোর গ্রুপের একটি বড় অংশ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষ করেছে। সম্প্রতি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় এ চক্রের ২৯ জন সদস্য। তাদের কাছ থেকেই বেরিয়ে আসছে রাষ্ট্রবিরোধী পরিকল্পনার নানা তথ্য।
সূত্র জানায়, প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়াদের একটি বড় অংশ অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। যারা এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ নিয়েছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বেশকিছু নেতাকর্মীও। ঢাকার পূর্বাচলে সি-সেল রিসোর্ট, কাঁটাবন রেস্টুরেন্ট, মিরপুর ডিওএইচএস, উত্তরায় ১২ নম্বর সেক্টরের প্রিয়াংকা সিটিসহ বৈঠক হয়েছে দিল্লি, কলকাতা ও গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এসব বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিলÑ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডকে গতিশীল ও সমর্থকদের উৎসাহিত ও দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে ফেসবুকে ‘ওডিবি-এম-১৭০১ (অপারেশন ঢাকা ব্লকেড)’ নামে একটি গোপন গ্রুপ খোলা হয়, যে গ্রুপটিতে অ্যাডমিন আমন্ত্রণ না জানালে কেউ যোগ দিতে পারবে না। এমনকি সেখানে কারা কারা সদস্যÑ সে বিষয়টিও গোপন রাখা হয়। পরিচয় গোপন রেখে ব্যবহার করা হয় বিশেষ কোড। গ্রুপটির অ্যাডমিন করা হয় সুমাইয়া তাহমিদ জাফরিনকে। তিনি অবসরপ্রাপ্ত মেজর সাদিকুল হকের স্ত্রী। আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাদের পাঠানো তথ্য গুগল শিটে এন্ট্রি দিতেন সুমাইয়া। তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তথ্য সংগ্রহ, গোপন কোড তৈরি এবং অনলাইন মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে সদস্যদের সমন্বয়ের কাজ করতেন। এমনকি রাজধানীর পথে পথে ঘুরে বেড়ানো টোকাইদেরও সংগ্রহ করে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের পরিকল্পনা হয় ওই গ্রুপের মাধ্যমে।
ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (অ্যাডমিন অ্যান্ড গোয়েন্দা-দক্ষিণ) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঠপর্যায়ে কোনো কার্যক্রম করতে না পারার কারণে সামাজিক মাধ্যম বেছে নিয়েছে। বিভিন্ন গ্রুপ খুলে অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে, যার কারণে দেশে বড় ধরনের কোনো অপতৎপরতা চালাতে পারছে না আওয়ামী লীগ।
এ বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সামাজিক মাধ্যমে গ্রুপ খুলে অপতৎপরতা এই প্রথম নয়, বিশ্বের বড় বড় নিষিদ্ধ সংগঠন এভাবে কার্যক্রম করে থাকে। কারণ এই প্রক্রিয়ায় তথ্যের সুরক্ষা বেশি। এছাড়া যেকোনো মুহূর্তে চাইলেই তারা গ্রুপটি বন্ধ করে দিতে পারে। যার ফলে তাদের তথ্যগুলোও মুছে যায়।
এই গ্রুপের সবশেষ বৈঠক হয় ৮ জুলাই রাজধানীর একটি কনভেনশন সেন্টারে। যেখানে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা মিলে ৩০০ থেকে ৪০০ জন অংশ নেন। তারা সেখানে সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। বৈঠকে পরিকল্পনা করা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ পাওয়ার পর সারা দেশ থেকে লোকজন এসে ঢাকায় সমবেত হবেন। তারা ঢাকার শাহবাগ মোড় দখল করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে দেশে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করবেন। এই বৈঠকের বিষয়টি গোয়েন্দারা জেনে যায় এবং পরবর্তীতে কয়েকজনকে আটক করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যে বেরিয়ে আসে এই গ্রুপের সব কথা।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া শম্পা ও সোহেল রানার জবানবন্দিতে উঠে আসে মূল মাস্টারমাইন্ড সুশান্ত দাস গুপ্ত, মেজর সাদিকুল হক, তার স্ত্রী সুমাইয়া জাফরিন ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট গুলশান আরার কথা।
এ ঘটনায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে চালক লীগের সভাপতি মিলন শিকদার বলেন, সোবহান গোলন্দাজ নামের একজন আওয়ামী লীগ সমর্থক তাকে ৮ জুলাইয়ের প্রশিক্ষণে নিয়ে যান। এই পুরো প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন মেজর সাদিকের স্ত্রী সুমাইয়া জাফরিন। তিনিই সবাইকে পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত বলেন। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, সুমাইয়াকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবি। রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের ঘটনায় সুমাইয়ার কী ভূমিকা ছিল, তার সঙ্গে আরও কারা ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
এ ঘটনায় জড়িত পলাতকদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে নতুন কোনো গ্রুপ খুলে আওয়ামী লীগ অপতৎপরতা চালাচ্ছে কি নাÑ সেটিও নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) কামরুল হাসান বলেন, এ ঘটনায় শুধু ডিবি নয়, আরও কয়েকটি সংস্থা কাজ করছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তীতে বড় ধরনের জমায়েত করার অবস্থায় নেই আওয়ামী লীগ। তাই বাধ্য হয়েই তারা সামাজিক মাধ্যমে নেতাকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছে। আর তারা যদি এই মুহূর্তে ঢাকা ব্লকেডের মতো কর্মসূচি দেওয়ার চেষ্টা করেও তাহলে শুভ ফল বয়ে আনবে না। বর্তমানে অনলাইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা অনেক বেড়েছে। ফলে সরকারবিরোধী বড় কোনো কর্মকাণ্ড নস্যাৎ করতে পারছে তারা।