ছড়িয়েছে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার আতঙ্ক
হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৪১ এএম
আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৫ ১৮:৩৮ পিএম
প্রতীকী ছবি
করোনার প্রকোপ কমলেও সারা দেশেই এখন ভাইরাস জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। প্রায় ঘরে ঘরেই এখন জ্বর, সর্দিকাশির রোগী। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাধারণ ভাইরাস জ্বরের (ফ্লু) রোগীর সংখ্যা বেশি। তবে, মশার প্রজনন মৌসুম চলায় দেশের বেশকিছু এলাকায় চোখ রাঙাচ্ছে এডিস মশাবাহিত ভাইরাস জ্বর ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া। যে কারণে অনেকে ডেঙ্গু মনে করে আতঙ্কিত হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কারও ডেঙ্গু, কারও চিকুনগুনিয়া ধরা পড়ছে। একই রকম উপসর্গ হওয়ায় চিকিৎসা দিতে সমস্যায় পড়ছেন চিকিৎসকরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আপাতত করোনা আক্রান্ত কম, তবে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, টাইফয়েড ও মৌসুমি জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে বেশিরভাগ মানুষ। চার থেকে পাঁচ দিনের জ্বর নিয়ে আসছেন রোগীরা। একজনের জ্বর হলে পরিবারের অন্যরাও জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। বেশি আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ ভাইরাস ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণজনিত জ্বরে। চিকিৎসকদের পরামর্শ, হালকা উপসর্গ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে ঘরে বিশ্রাম নিতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, মাস্ক পরা ও যতটা সম্ভব গরম তরল খাবার খেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া জ্বরের প্রথম তিন দিনের মধ্যে কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যাবে না।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেশ কয়েকটি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরে হাসপাতালগুলোতে জ্বর নিয়ে আসার রোগীর চাপ বেড়েছে। গত মাসের তুলনায় চলতি মাসে বেড়েছে জ্বরের ওষুধের চাহিদ। এ সময়ে বেড়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সব রোগীর পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে না হওয়ার জন্য এর সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত মাসের প্রথম দশ দিনের (৩ হাজার ৬৩৫ জন) তুলনায় এ মাসের দশ দিন পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগী (৩ হাজার ২০৩ জন) কিছুটা কম হলেও ভয় কমেনি একটুও। কারণ গত মাসের প্রথম দশ দিনে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল ১২ জনের কিন্তু আগস্টের ১০ দিনে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জন। অন্যদিকে, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের সঠিক তথ্য না পাওয়া গেলেও এ রোগ নিয়েও বেশ আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ।
গতকাল রবিবার রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডেকেল হাসপাতাল, মিডফোর্ড হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি হাসপাতালে এবং সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা বা সর্দি-জ্বরের রোগী এবং চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। সারা দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য দিতে পারেনি। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে গতকাল (গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায়) সারা দেশে ৪৪৮ জন নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ডেঙ্গু আক্রান্ত হলো ২৪ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ১ হাজার ৩৭৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৩৮৯ জন, বাকি ৯৮৫ জন ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগের। আর হাসপাতাল থেকে চলতি বছরে এ যাবৎ ২২ হাজার ৭০৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।
এ বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মো. মুশতাক হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এ বছর ইনফ্লুয়েঞ্জা বেশি হচ্ছে। গত বছরের চেয়ে এ বছর ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াও বেশি হচ্ছে। আমাদের কাছে সারা দেশে ডেঙ্গুর মতো চিকুনগুনিয়া নিয়ে সেভাবে তথ্য নাই। তবে, চিকুনগুনিয়া বেশি হচ্ছে চট্টগ্রামে। এখানে ডেঙ্গুর মতোই চিকুনগুনিয়ার রোগী আছে। ঢাকাতেও চিকুনগুনিয়ার রোগী আছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল্লাহ বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত সংখ্যার মতো প্রায় চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। চিকুনগুনিয়ায় রোগে মৃত্যু কম, কিন্তু এ রোগে মানুষকে ভোগায় বেশি। জ্বর সেরে গেলেও ব্যথাটা অনেক সময় কয়েক সপ্তাহব্যাপী ভোগায়। যাদের বাতে ব্যথা আছে তাদের চিকুনগুনিয়া হলে ব্যথাটা বেড়ে যায়।
আইইডিসিআর উপদেষ্টা ডা. মো. মুশতাক হোসেন এবং অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল্লাহ জানাচ্ছেন, এই সময়ে জ্বর নিয়ে ভয় না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তারা বলেন, যে জ্বরই হোক না কেন; অস্থির হওয়া যাবে না। এই সময়ে ঘন ঘন তরল খাবার খেতে হবে।’এ ছাড়াও এডিস মশার কামড় থেকে বাঁচতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দেন তারা।
চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ এবং রংপুর বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় সব জায়গায় গত জুন-জুলাইয়ের চেয়ে চলতি আগস্টে চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু ও সাধারণ ভাইরাস জ্বরের (ফ্লু); জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। এসব অঞ্চলের চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, চার ধরনের জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। এর মধ্যে চিকুনগুনিয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে উচ্চমাত্রার জ্বর, অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা, কখনও ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া এই দুটি রোগের উপসর্গ কাছাকাছি, ছড়ানোর মাধ্যমও এক। অনেক রোগী একই সঙ্গে দুটি রোগেই আক্রান্ত হচ্ছে। চিকুনগুনিয়া আর ডেঙ্গু একসঙ্গে হলে পার্থক্য করা কঠিন। সেজন্য যদি কোনো ব্যক্তির জ্বর ও গেঁটে তীব্র ব্যথা থাকে, তখন ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া উভয়ের পরীক্ষা করা উচিত।
ডাক্তাররা বলছেন, দুটি সংক্রমণের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধও নেই। পর্যাপ্ত পানি পান, বিশ্রাম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল দেওয়া হয়। তবে রোগ শনাক্ত করা জরুরি। ডেঙ্গু খুব দ্রুতই হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী। প্রতিবছর প্রচুর রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম’। এর লক্ষণের মধ্যে আছে নাক বা দাঁত দিয়ে রক্তপাত, কালো পায়খানা, নারীদের মাসিকের অতিরিক্ত রক্তপাত বা হঠাৎ মাসিক হওয়া। এসব লক্ষণ থাকলে রোগীকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। তবে, চিকুনগুনিয়া প্রাণঘাতী নয়। কিন্তু এই রোগটির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকে শরীরে। চিকুনগুনিয়াজনিত অস্থিসন্ধির ব্যথা থাকতে পারে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত।