× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কলিমুল্লাহ কাণ্ড

লিয়াজোঁ অফিস ঢাকায়, দুর্নীতি চলত রংপুরে

মেরিনা লাভলী, রংপুর

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৫ ১০:০৬ এএম

বেরোবির সাবেক ভিসি নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ

বেরোবির সাবেক ভিসি নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ

দুদকের মামলায় গ্রেপ্তারের পর ফের আলোচনায় এসেছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহর অনিয়ম-দুর্নীতি। সামাজিক মাধ্যমে তার আমলে স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির নানা তথ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেরোবির উপাচার্যের মধ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বেচ্ছাচারিতার শীর্ষে ছিলেন তিনি। ড. কলিমুল্লাহই একমাত্র উপাচার্য, যার অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ৭৯০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৭ সালের ১৪ জুন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে যোগদানের পর ড. কলিমুল্লাহ ইউজিসির অনুমোদন ছাড়াই ঢাকার মোহাম্মদপুরে লিয়াজোঁ অফিস খোলেন। লিয়াজোঁ অফিসে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার নামে নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, ভুয়া বিলে অর্থ আত্মসাৎ করেন উপাচার্য। সিন্ডিকেটের সব সভা, নিয়োগ, আপগ্রেডেশন ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসে করায় শত শত শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীকে সময় ও অর্থ খরচ করে রংপুর থেকে ঢাকায় যেতে হতো। সেই সময় লিয়াজোঁ অফিসকে দুর্নীতির নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করেছেন নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ।

ওই সময় তার দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত কিছু শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়ে সংঘবদ্ধ দুর্নীতির চক্র তৈরি করেছিলেন। তাকে অনুসরণকারীরা মাথা ন্যাড়াসহ অধ্যাপক কলিমুল্লাহর নির্দেশিত ড্রেস কোড অনুসরণ করতেন। এর মধ্যে তৎকালীন ঢাকার লিয়োজোঁ অফিসে পরীক্ষা দিয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মধ্যে রেজাউল ইসলাম লাবু, তাপস কুমার গোস্বামী, মোবাশ্বেরুল ইসলাম, আনোয়ারুল ইসলামসহ অনেকে চুল ছোট করাসহ মাথা ন্যাড়া করেছিলেন। সেই সঙ্গে পদোন্নতি পাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীরাও ছিলেন এই তালিকায়।

উপাচার্য হিসেবে কর্মজীবনে ১ হাজার ৩৫২ দিনের মধ্যে তিনি ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২৩৭ দিন। উপস্থিত দিনের মধ্যে তিনি বেশিরভাগ দিন এক-দুই ঘণ্টার জন্য ক্যাম্পাসে থেকে পরে ঢাকায় চলে যেতেন। অথচ রাষ্ট্রপতি কর্তৃপক্ষ ২০১৭ সালের ১ জুন ইস্যুকৃত তার নিয়োগ প্রজ্ঞাপনের ৪ নম্বর শর্তে উল্লেখ ছিলÑ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সার্বক্ষণিকভাবে ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন।

অভিযোগ রয়েছে, অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহর বিরুদ্ধে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সংস্থা জানিপপ এবং কিছু কিছু অঞ্চলের প্রার্থীরা বেশি প্রাধান্য দিতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ও উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে ওই অনুষদের ডিনের পদেও ছিলেন অধ্যাপক কলিমুল্লাহ। উপাচার্য হিসেবে তিনি নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি, অনুষদের ডিন হিসেবে নিয়োগ বোর্ডের সদস্য আর বিভাগীয় প্রধান হিসেবে তিনিই ছিলেন নিয়োগ কমিটির সদস্য। আর সেই সঙ্গে তার মাকে বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে নিয়োগ বোর্ডে রাখা হয়েছিল। সেই সময় উপাচার্য ও তার মা মিলে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন।

অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ক্রয় ক্ষেত্রেই সরকারি ক্রয়নীতি অনুসরণ না করে কেনাকাটা করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প ছাত্রীদের ১০ তলাবিশিষ্ট হলের চার তলা ছাদ ঢালাই হয়েছিল। এই প্রকল্পে উপাচার্যসহ কয়েক কর্মকর্তার নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ পায় ইউজিসি। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের সঙ্গে সংযোগ সড়ক করার নামে ইট বিছানো রাস্তা নির্মাণ দেখিয়ে অধ্যাপক কলিমুল্লাহর বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহর একাডেমিক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল শীর্ষে। তিনি উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর প্রায় তিন বছর পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান ও পরিচালকসহ একাই ১৬টি প্রশাসনিক পদে থেকে নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম করেছেন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর আইনের ২৬ (৫) ধারা লঙ্ঘন করে ৬টি অনুষদের মধ্যে ৪টির ডিনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পরে সমালোচনার মুখে তিনি ৩টি অনুষদের ডিন পদ ছেড়ে দিলেও যোগ্য অধ্যাপক থাকা সত্ত্বেও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন পদ ধরে ছিলেন।

অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে কথা বললে ড. কলিমউল্লাহ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বরখাস্ত ও সতর্ক নোটিস জারি করতেন। কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত নিয়ে অবৈধভাবে শো-কজ নোটিস দিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি আইন লঙ্ঘন করে ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিলেন। ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার না পেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। আদালত থেকে যে নির্দেশ দেওয়া হয় সেটিও তিনি অমান্য করেন।

অধ্যাপক কলিমুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠলে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শিক্ষকরা। ২০২১ সালের ১৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন অধিকার সুরক্ষা পরিষদের ব্যানারে অধ্যাপক ড. কলিমুল্লাহর বিরুদ্ধে ৭৯০ পৃষ্ঠার দুর্নীতির শ্বেতপত্রের প্রথম খণ্ড প্রকাশ করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহর পছন্দের পাত্র না হলে পদোন্নতি পাওয়া যেত না। এক শিক্ষক ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসে যাননি বলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাকে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তার পছন্দ অনুযায়ী অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী মাথা ন্যাড়া করেছিলেন।

অধিকার সুরক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মতিউর রহমান বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের সীমাহীন দুর্নীতি শিক্ষক সমাজকে লজ্জিত করেছে। আমরা গণমাধ্যমে গবেষণাপত্র বা গবেষণার ফল প্রকাশ না করে উপাচার্যের অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা প্রকাশ করেছিলাম। একজন উপাচার্য প্রকৃত অভিভাবক হয়ে দেশ ও দেশান্তরে শিক্ষার দ্যুতি ছড়িয়ে দেন। অথচ সেই সময় উপাচার্য ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। দীর্ঘদিন পরে হলেও তাকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অনিয়ম-দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্তসহ দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হোক।

এ ব্যাপারে বেরোবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত দুদক মামলার স্বার্থে আমার কাছে কোনো নথিপত্র চায়নি। চাইলে তাদের সরবরাহ করা হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা