× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে লাগবে সমীক্ষা, দিতে হবে অর্থ

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৫ ০০:৫৭ এএম

ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে লাগবে সমীক্ষা, দিতে হবে অর্থ

সরকার শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে নীতিমালা করবে। এজন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ‘শিল্প খাতে পানি ব্যবস্থাপনা নীতি-২০২৫’ শিরোনামে একটি খসড়া প্রকাশ করেছে। খসড়ায় কোন স্থানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে কী ধরনের প্রভাব পড়বে সে বিষয়ে সমীক্ষার পর প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন মিলবে। তা ছাড়া এতে পানির ন্যায্য ব্যবহার, অপচয় রোধ, পানির মূল্য নির্ধারণসহ বিভিন্ন বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ঝরনার পানি বাণিজ্যিকীকরণের বিষয়টি স্থান পেয়েছে। 

খসড়ায় বলা হয়েছে, এ নীতিমালা শিল্প খাতে পানির পরিমিত বণ্টন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, আহরণ, পানির উৎস সংরক্ষণ, পানির সংযোজক ব্যবহার, পানি ধারক স্তরের সুরক্ষা, পানির বিকল্প উৎস সৃজন ও ব্যবহার, পানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি, পানির প্রাপ্যতার ভিত্তিতে শিল্পাঞ্চল চিহ্নিতকরণ বিষয়ে ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিরূপণে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেবে। 

খসড়ায় শিল্প খাতে পানি ব্যবস্থাপনা নীতির লক্ষ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, নিরাপদ ও সর্বোত্তম পানির ব্যবহারের মাধ্যমে সমৃদ্ধ এবং টেকসই শিল্পায়ন নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন; সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য অর্জনে সামাজিক সাম্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং টেকসই পরিবেশসম্মত শিল্পায়ন; শিল্প খাতে পানি সম্পদের উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, সরবরাহ ও পানিসংক্রান্ত সেবাসমূহ নিশ্চিত করা এবং আধুনিক ও লাগসই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল শিল্প খাতে সম্ভাব্য জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিবেচনায় পানি ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করা।

পানি ব্যবস্থাপনা নীতির উদ্দেশ্য সম্পর্কে খসড়ায় বলা হয়েছে, শিল্প খাতে পানি ব্যবহার সর্বোত্তম করা; শিল্প খাতে পানির বিকল্প উৎসসমূহ চিহ্নিতকরণ, অপচয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, শিল্প খাতে সমন্বিত পানির চাহিদা নিরূপণ ও মূল্য নির্ধারণ করা, শিল্পবর্জ্যজনিত পানিদূষণ হ্রাস করা এবং শিল্প খাতে পানি ব্যবহারের নিয়মিত নিরীক্ষণ করা ইত্যাদি।

খসড়ায় সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য তিনটি মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ সামাজিক সাম্য, অর্থনৈতিক দক্ষতা ও টেকসই পরিবেশ। এসব মূলনীতি বাস্তবায়নে দুষ্প্রাপ্য অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে পানির মূল্যায়ন, পানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করা ও পরিবেশগত পানির প্রবাহ এবং পারিপার্শ্বিক পানির গুণগতমান বজায় রাখতে টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা। 

সর্বজনীন সম্পদ হিসেবে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনায় সুশাসন ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে খসড়ায়। পানি সম্পদের বণ্টন ও মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বাহ্যিকতা অন্তর্ভুক্তি করার বিষয়টি স্থান পেয়েছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য পানির সামগ্রিক ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে পানির মূল্য, বর্জ্য-শুল্ক, প্রণোদনা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।

ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনে ক্ষতির মুখে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য

শিল্পাঞ্চলে পানির অপ্রত্যাশিত ব্যবহার, দূষণ ও অপচয়ের কারণে কৃষি, পরিবেশ, মৎস্য সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। দেশের জেলাগুলোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে সবচেয়ে বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব শিল্পে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে ও দূষণ বাড়ছে। বিশেষ করে গাজীপুরের শিল্পকারখানার দূষিত পানির কারণে জেলাটির বেলাই বিলের কৃষি ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। এতে কৃষি ফসলের আবাদ কমছে। 

এ ব্যাপারে গাজীপুরের কালিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারজানা তাসলিম বলেন, গাজীপুরে শিল্পকারখানার জন্য পানি উত্তোলন করায় এখানে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বেলাই বিল গাজীপুর সদর, কালীগঞ্জ ও শ্রীপুরসহ তিন উপজেলায় বিস্তৃত। জেলাটিতে অত্যধিক ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার, দূষণ ও অপচয়ের কারণে কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে বেলাই বিলের কৃষি হুমকিতে পড়েছে। বিলটিতে শুধু বোরো ধান চাষ করা হয় কিন্তু কলকারখানার দূষিত পানির কারণে ধানের আবাদ কমে যাচ্ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচের খরচ বেড়েছে। তা ছাড়া এখানকার ক্ষেত-খামারে কাজ করলে শরীরে চর্মরোগ হচ্ছে। 

পানির মূল্য নির্ধারণ করবে সরকার

খসড়ায় পানির মূল্য নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে, ‘মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য পানির মূল্য তুলনামূলক কম ধার্য করা এবং বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতে ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অধিক ও পৃথক মূল্য ধার্য করা হবে। ভূ-ওপরিস্থ ও ভূ-গর্ভস্থ পানির মূল্য যথাসম্ভব সরবরাহ সেবার প্রকৃত মূল্য দ্বারা নির্ধারিত হবে।’ 

পানির ছায়া মূল্য নির্ধারণে প্রান্তিক ক্ষতি ব্যয় ও প্রান্তিক হ্রাস ব্যয় উভয় বিষয় মূল্য বিবেচনায় নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পানি দূষণজনিত ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে শিল্পক্ষেত্রে পানির ছায়া মূল্য নির্ধারণ করা হবে। 

ঝরনার পানি বাজারজাত ও রপ্তানি করা হবে

খসড়ায় বলা হয়, বিশ্ববাজারে ঝরনার পানির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এসব পানি উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। তাই ঝরনার পানির অপ্রতুলতার কারণে পরিবেশ ও প্রতিবেশগত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সম্ভাব্যতা যাচাই করে সরকারি উদ্যোগে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে পানি বাজারজাত করা হবে। প্রয়োজনে বিদেশে রপ্তানি করা হবে।

যা বলছেন ব্যবসায়ীরা

ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার হয় এমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে এগিয়ে রয়েছে তৈরি পোশাক খাত। এ খাতে পোশাক প্রস্তুত, ধৌতকরণসহ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রচুর পানির ব্যবহার হয়। শিল্পে পানির ব্যবহার নীতিমালার খসড়া সম্পর্কে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও অনন্ত গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইনামুল হক খান বলেন, আমি নীতিমালাটি এখনও দেখিনি। তবে পোশাক খাতে ধৌত করার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পানির ব্যবহার হয়ে থাকে। 

তিনি বলেন, পানি সকলেরই প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে এর ব্যবহার অবশ্যই পরিমিত হওয়া দরকার। কেননা একটি ট্রাউজারে ওয়াশের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাব ১৫ লিটার ও অত্যাধুনিক হলে ৪০ লিটার বা এক মণ পানির প্রয়োজন। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেলে বা রিজার্ভ শেষ হয়ে গেলে আমরা সকলেই বিপদে পড়ব। ইনামুল হক খান বলেন, আমরা শিল্পে যে পানি ব্যবহার করি তার মধ্যে ৬০-৭০ শতাংশ রিসাইকেল করে থাকি। তা ছাড়া ইটিপির মাধ্যমে কারখানা থেকে পরিষ্কার পানিই ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে করে পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি হয় না। 

ভুক্তভোগী ও প্রশাসন কর্মকর্তাদের ভাষ্য

ভূ-গর্ভস্থ পানির অভাবে স্থানীয়দের কী ধরনের সমস্যা পোহাতে হচ্ছে সে সম্পর্কে কালীগঞ্জের বাসিন্দা ও পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ এবং পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বেলাই বিলের পাশেই আমার বাড়ি। আগে এখানে প্রচুর মাছ ছিল কিন্তু কলকারখানার দূষিত বর্জ্যের কারণে তা মাছসহ জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। মাটি দূষিত হচ্ছে। ফসল দূষিত হচ্ছে। 

তিনি বলেন, শিল্পের জন্য যতটুকু পানি দরকার তার চেয়ে বেশি ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। বর্তমানে ভূ-গর্ভস্থ পানির ক্ষেত্রে গাজীপুর রেড জোনে রয়েছে। আবার সেই ভূ-গর্ভস্থ ভালো পানি উঠিয়ে ব্যবহার করে দূষিত করে ছেড়ে দেওয়ায় পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। তাই এ ক্ষেত্রে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স থাকতে হবে। আর তা হচ্ছে, যেনতেনভাবে পানি উত্তোলন করা যাবে না। আবার পানি উত্তোলন করলে রাজস্ব দিতে হবে। তখন ইচ্ছামতো পানি ওঠাবে না। 

ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পানি না ‍তুলে অন্য খনিজ পদার্থ ওঠালে রাজস্ব দিতে হতো। ভূ-গর্ভস্থ পানিও তো আমাদের সম্পদ। অথচ এটি আমরা বিনামূল্যে দিয়ে দিচ্ছি। বিনামূল্যে পেলে মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তোলে, অপচয় করে। 

শিল্পে পানির ব্যবহার মিতব্যয়ী করাই আমাদের উদ্দেশ্য বলে মন্তব্য করেছেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমুল আহসান। তিনি বলেন, আমাদের এই নীতিমালা তৈরির মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে, যাতে শিল্পে পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া যায়। কেননা আমাদের কলকারখানাগুলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি উত্তোলন ও ব্যবহার করে থাকে। মূল্য নির্ধারণ করা হলে কলকারখানায় অতিরিক্ত পানির ব্যবহার হবে না। 

তিনি বলেন, অনেক দেশই শিল্পে পানির পরিমিত ব্যবহার রয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি, এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে পারলে পানি সংকট কেটে যাবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা যাবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা