প্রধান উপদেষ্টা সচিবালয়ে অফিস করবেন আজ
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ০০:৫৪ এএম
৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্বিতীয়বারের মতো আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অংশ নিতে যাচ্ছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সকালে নবনির্মিত ভবনের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে বৈঠকটি হবে। বৈঠকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নির্বাচনকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কঠোর অবস্থান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিব পদে রদবদল ও মাঠ প্রশাসনে ডিসি, এসপি পদায়নে করণীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত হতে পারে। গত এক বছরে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি সম্পর্কিত প্রতিবেদন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে উত্থাপন হতে পারে বলে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও সচিবালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তির দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের পরবর্তী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এ প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই বলেছে, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের জন্য তারাও তাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তাই নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিতে পারেন তিনি। এ ছাড়াও গত এক বছরে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে সচিবদের দেওয়া এক গুচ্ছ নির্দেশনার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এদিকে গতকাল বুধবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন-বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিনিয়র এক সচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা দ্বিতীয়বারের মতো সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আজ পরিষদের বৈঠক করছেন। মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো কার্যকর করার নির্দেশনা ছাড়াও আরও কিছু নির্দেশনা দিতে পারেন তিনি। সেগুলো হলো অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়ন।সচিবরা অগ্রগতি ও করণীয় সম্পর্কে সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করেছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত এক বছরে সচিব ও সিনিয়র সচিব পদের ৯ জনসহ মোট ২৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। এক বছরে নিয়মিত ও ভূতাপেক্ষ মিলিয়ে এক হাজার ৫৪৯ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। নানা অনিয়মের অভিযোগে ২৪টি বিভাগীয় মামলা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে । এতে বলা হয়, গত বছরের ৮ আগস্ট থেকে বর্তমান পর্যন্ত এক বছরে অতিরিক্ত সচিব পদের ১৯ জন, গ্রেড-১ একজন এবং সচিব-সিনিয়র সচিব ৯ জনসহ সর্বমোট ২৯ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে উপসচিব ১৪১ জন, যুগ্ম সচিব ৪২৪ জন, অতিরিক্ত সচিব ১৪৯ জন, গ্রেড-১ ২৬ জন এবং সচিব-সিনিয়র সচিব ৪৫ জনসহ মোট ৭৮৫ জন কর্মকর্তাকে নিয়মিত পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে উপসচিব চারজন, যুগ্ম সচিব ৭২ জন, অতিরিক্ত সচিব ৫২৮ জন, গ্রেড-১ ৪১ জন এবং সচিব ১১৯ জনসহ সর্বমোট ৭৬৪ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে গত এক বছরে উপসচিব ১৬ জন, যুগ্ম সচিব ১৫ জন, অতিরিক্ত সচিব ৭৫ জন, গ্রেড-১ ৩৪ জন এবং সচিব-সিনিয়র সচিব ২৪ জনসহ মোট ১৬৪ জন কর্মকর্তা কর্মকাল শেষে স্বাভাবিক অবসরে গেছেন। এক বছরে ২৪টি বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়, ৮টি বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তি করা হয়। এ ছাড়াও ১৬টি বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে। এক বছরে তিনটি অধ্যাদেশ প্রণয়ন, তিনটি বিধিমালা সংশোধন, একটি বিশেষ বিধিমালা প্রণয়ন এবং ২২টি নিয়োগ বিধিমালা বা প্রবিধানমালা প্রণয়ন/সংশোধনে সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। গত এক বছরে জনপ্রশাসনে নেওয়া উপরিউক্ত সিদ্ধান্তগুলো প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করা হতে পারে।
সূত্র বলছে, গত বছর ৪ সেপ্টেম্বর সচিব সভায় প্রধান উপদেষ্টা সচিবদের উদ্দেশে যে ২৫ দফা নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কত দূর সফল হয়েছে সে বিষয়ে উপদেষ্টা পরিষদকে অবগত করা হতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছর ২০২৪ সালে ৪ সেপ্টেম্বর প্রথম সচিব সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে নিজের অধীন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে সব সচিবের উপস্থিতিতে সচিব সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার প্রেক্ষিতে সচিবদের উদ্দেশে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিলÑ সরকারের সব পর্যায়ে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে প্রধান উপদেষ্টার দেওয়া ‘মার্চিং অর্ডার’ অনুসরণ করা। সৃষ্টিশীল, নাগরিকবান্ধব মানসিকতা নিয়ে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার পরিকল্পনা এবং স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন করতে হবে। সংস্কার কর্মসূচি প্রণয়নে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা ও তাদের মতামত নেওয়া, বিবেক ও ন্যায়বোধে উজ্জীবিত হয়ে সবাইকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সততা, নিষ্ঠা, জবাবদিহি নিশ্চিত করে নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে। সেবাপ্রার্থীদের কেউ যেন ভোগান্তি, হয়রানি কিংবা কোনো কারণে দীর্ঘসূত্রতার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।
উল্লেখ্য, গত ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর প্রধান উপদেষ্টার রাষ্ট্রীয় বাসভবন যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক হতো। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংস্কার করার পর এটিকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। এর পর থেকে নিয়মিতভাবে সেখানেই উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার পর গত বছরের ২০ নভেম্বর সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের ১৩ তলায় মন্ত্রিসভা কক্ষে উপদেষ্টা পরিষদের একটি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এটি তার দ্বিতীয়বারের মতো সচিবালয়ে আসা। তবে নতুন ভবনে এটাই প্রথম উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক। গত বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর প্রধান উপদেষ্টার রাষ্ট্রীয় বাসভবন যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক হতো। সরকার পতনের দিন ক্ষতিগ্রস্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংস্কারের পর এটিকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে রূপান্তরের পর থেকে নিয়মিতভাবে সেখানেই উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক হচ্ছে।