ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি
দীপক দেব
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:১৪ এএম
আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:২১ এএম
জুলাই সনদ এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে দলগুলোর মধ্যে একমত হওয়ার অপেক্ষায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। দুই দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে যে ৮১টি সংস্কার প্রস্তাব তুলে এনেছে তা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে শেষ মুহূর্তের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে কমিশনের সদস্যরা। এর পরে বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে দলগুলোর স্বাক্ষরের পর তা প্রকাশ করা হতে পারে। অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তীর মধ্যে সনদ প্রকাশের জোর দাবি তোলা হলেও আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বিষয়টি নিয়ে দ্বিমত থাকায় তা করা সম্ভব হয়নি।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসন অবসানের পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা শুরু হয়। গণতন্ত্রের পথে ক্ষমতায় এসে আবার যেন কেউ কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করতে না পারে, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অবিচার, দুঃশাসন আর বৈষম্যের যেন অবসান হয়, সত্যিকার অর্থে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হয়ে ওঠার পথে এগিয়ে যেতে পারে, সেজন্য সংবিধান আর শাসন পদ্ধতিতে বড় ধরনের সংস্কারের দাবি সামনে আসে।
সেই দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মোট ১১টি সংস্কার কমিশন করে। এর মধ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ১৬৬টি সুপারিশের বিষয়ে ৩৮টি রাজনৈতিক দল ও জোটের মতামত জানতে চায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। দলগুলোর মধ্যে ৩৩টি তাদের মতামত দেয়। এরপর ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত দলগুলোর সঙ্গে ৪৫টি অধিবেশনের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ের সংলাপ শেষে ৬২টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়। যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলগুলোর মতভিন্নতা ছিল, সেসব বিষয়ে নিয়ে গত ৩ জুন থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা। ৩১ জুলাই পর্যন্ত মোট ২৩ দিন প্রায় ত্রিশটি দলকে নিয়ে একসঙ্গে বসে দশটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ মোট ১৯টি বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরেছে কমিশন। দুই দফায় কিছু বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট সহ মোট ৮১টি বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সংলাপ পর্ব শেষ করার পর রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্দেশ্য করে ঐকমত্য কমিশনের সহ সভাপতি আলী রীয়াজ বলেন, সনদের পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে দলগুলোর কাছে খসড়া তুলে ধরে বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা করা হবে। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৩ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে ঐকমত্য কমিশনের কার্যালয়ে বৈঠকে বসে কমিশনের সদস্যরা। এই সভায় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনার যে সকল বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা পর্যালোচনা করা হয়। সভায় আরো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ঐকমত্য হওয়া প্রস্তাব বা সুপারিশসমূহের বিষয়ে কমিশন পর্যায়ক্রমে বিশেষজ্ঞগণের সঙ্গে এবং সেই ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে কথা বলবে। এসব প্রস্তাব বা সুপারিশ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে কমিশন, রাজনৈতিক দল ও জোট এবং সরকারের করনীয় বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখা হবে।
এর আগে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও এর বাস্তবায়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান জানানোর জন্য জোড়ালোভাবে দাবি তুলে ধরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। গত ৩১ জুলাই সংলাপের শেষ দিন দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের জানিয়েছেন, ‘আইনি ভিত্তি না দিলে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে না তার দল। কারণ নির্বাচিত সরকার এসে এটি আইনে রূপ দেবে তার নিশ্চয়তা নেই। তাই যা করার এখানই করতে হবে। আইনি ভিত্তি না থাকলে এই চার্টার (সনদ) মূল্যহীন হয়ে পড়বে।’
তবে বিষয়টি নিয়ে আইনি ভিত্তি দেওয়ার পক্ষে নয় দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জনগণের সার্বভৌম এখতিয়ারের ভিত্তিতেই আমরা এই ঘোষণাপত্রকে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করছি। সেটা আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছি। এর চেয়ে বড় জাতীয় সম্মতি আর নেই। এটা আইনের ঊর্ধ্বে। এটা জনগণের অভিপ্রায়।’
জামায়াত এনসিপি সহ বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে আইন অথবা অধ্যাদেশ দিয়ে দ্রুত সংস্কারের বিষয়গুলো বাস্তবায়নের যে দাবি তোলা হয়েছে সেটাও সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে একটা বড় বিতর্ক রয়েছে। আগাসী সংসদে এটা বাস্তবায়ন হবে এটাই মেজর মতামত, মূল মতামত। এর বাহিরে মতামত আছে, গণভোটে যাওয়ার বিষয়ে সংবিধান সভার আগে নির্বাচন করার। অথবা যে সনদ স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে এর একটা আইনি ভিত্তি দিতে অধ্যাদেশ জারি করার। অধ্যাদেশের গুরুত্ব থাকলেও আখেরি কোন রাজনৈতিক গুরুত্ব নেই। কারণ এই অধ্যাদেশ পরবর্তী সংসদ রাখতেও পারে নাও পারে। এটা নিয়ে একটা মেজর বিতর্ক হবে। তবে আমার কাছে যেটা মনে হয় শেষ পর্যন্ত এটার সমাধাণ সংসদের মাধ্যমে হবে।
তবে এর একটা আইনি ভিত্তি থাকা প্রয়োজন বলে জোড়ালো ভাবে মনে করেন জাহাঙ্গীন নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তানা হলে এটা হবে পর্বতের মুষিক প্রসব এর মতো। কারণ মানুষ আসু পদক্ষেপ দেখতে চায়। আর এমন কিছু দেখতে না পারলে মানুষ হতাশ হবে। এজন্য জুলাই চার্টার্ডের মধ্যেই আইনি বিষয়টাও উল্লেখ্য করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তবে এই আইনি ভিত্তির জন্য দলগুলোর একমতে আসা প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিশেষ করে বড় দল যারা আগামী দিনে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসতে পারে তাদের সম্মতি বেশি প্রয়োজন। তানা হলে এটার আইনি ভিত্তি পাওয়া কঠিন হবে। এখন বিএনপি যদি তার অবস্থান থেকে সরে এসে অন্য দলগুলোর দাবির প্রতি সমর্থন দেয় তবেই এটা সম্ভব। অন্যথায় এই বিতর্কের সমাধাণ খুব বেশি সহজ হবে না।’ যদিও শেষ দিনের আলোচনাতেই ঐকমত্য কমিশনের সহ সভাপতি ড. আলী রীয়াজ দলগুলোকে এই সমস্যা পথ বের করার পরামর্শ দিয়ে কমিশন অনুঘটকের ভুমিকা পালন করবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন। সেই হিসেবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দলগুলোর মধ্যে আলোচনার মধ্যদিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হবে বলে এমটা মনে করছেন অনেকেই।