সাক্ষাৎকার : নাছির উদ্দীন
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ১০:৫৩ এএম
আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:৪৩ এএম
নাছির উদ্দীন
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেওয়া সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। বৈষম্যবিরোধী এই আন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ যেমন নজর কেড়েছে, তেমনি নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক। আন্দোলনটি ক্রমে ফ্যাসিবাদবিরোধী এবং সরকার পতনের একদফা দাবিতে রূপ নেয়। আজ ৩৬ জুলাই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ভূমিকা গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি, জুলাইয়ের চেতনা ও ছাত্ররাজনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সাথে কথা বলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন। সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে আন্দোলনের ভেতরের অনেক অজানা তথ্য ও ছাত্র রাজনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাউসার আহমেদ।
প্রবা: কোটা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান এই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হয়েছে। এই আন্দোলনে ছাত্রদলের কী ভূমিকা ছিল?
নাছির উদ্দীন : ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় আমরা সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যেই আন্দোলনে অংশ নিই। অনেক নেতাকর্মী সে সময় আহত-নিহত হন। ২০২৪ সালে হাইকোর্টের রায়ের পর আন্দোলন আবার শুরু হয়। ঈদের আগে 'ছাত্রশক্তি' আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে একসাথে কাজ করার প্রস্তাব দেয়। আমরা কৌশলগতভাবে আন্দোলনে যুক্ত হই। আবু সাইদ ও ওয়াসিম শহিদ হওয়ার পর আন্দোলনের গতি বদলে যায়—এটি তখন রাজনৈতিক রূপ নেয় এবং ধীরে ধীরে সরকার পতনের একদফা আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। আমাদের নেতা তারেক রহমান সে সময় বলেন, এই আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কার নয়, এটি এখন সরকারের পতনের আন্দোলন। সেই অনুযায়ী ছাত্রদল নেতৃত্ব দিয়েছে।
প্রবা: এই আন্দোলনে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র’-রাই পুরো কৃতিত্ব নিচ্ছে—আপনি কীভাবে দেখছেন?
নাছির উদ্দীন : কৃতিত্ব নেওয়ার প্রবণতা দুঃখজনক। আমরা যখন আন্দোলনে যুক্ত হই, তখন জানতাম না এটি কোথায় গড়াবে। আন্দোলন ধাপে ধাপে এগোয়। যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তি ছিল, তারা জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা ছিল, তারাই খুনি হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। আমাদের ১৪২ জন নেতাকর্মী শহিদ হয়েছেন, কিন্তু আমরা কৃতিত্ব দাবি করি না। আমাদের লক্ষ্য ছিল খুনি হাসিনার পতন, এবং সেটি সম্ভব হয়েছে। অথচ যারা শহিদ ও আহত হয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হয়নি। কিছু লোক শুধু কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, যা গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাবিরোধী।
প্রবা: আন্দোলনের সময় আপনাদের দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে কী বার্তা ছিল?
নাছির উদ্দীন: আন্দোলন শুরু হয় নিরপেক্ষ ব্যানারে। যদি কোনো দলীয় ব্যানারে আন্দোলন হতো, তাহলে তা বিতর্কিত হয়ে যেত। শুরুতে আমরা কৌশলগতভাবে নেতৃত্ব সাজিয়েছিলাম—সিনিয়ররা পিছনে, জুনিয়ররা সামনে। ১৬ তারিখ পর্যন্ত এভাবে চলেছে। প্রতিটি ইউনিটকে সক্রিয় রাখা হয় এবং সবাইকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা হয়।
প্রবা: আন্দোলনের এক বছর পর ছাত্ররাজনীতিতে কী গুণগত পরিবর্তন এসেছে?
নাছির উদ্দীন: প্রত্যাশার মতো গুণগত পরিবর্তন না এলেও ইতিবাচক দিকও আছে। এখন আর ক্যাম্পাসে জোর করে মিছিলে নেওয়া হয় না, শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের রাজনীতি প্রায় শেষ। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মতভেদ থাকলেও সবাই রাজনীতি করতে পারছে—এটা বড় অর্জন।
প্রবা: কর্মসংস্থান নিয়ে ছাত্র সংগঠন ও রাষ্ট্র কী চিন্তা করেছে? আপনাদের মূল্যায়ন কী?
নাছির উদ্দীন: নীতিগত প্রস্তাব ছাত্র সংগঠন দিতে পারে, বাস্তবায়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। গত এক বছরে কর্মসংস্থান যতটা হওয়া দরকার ছিল, তা হয়নি। তবে গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচিত হলে এ বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে বলে মনে করি।
প্রবা: রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করলেও ছাত্রদের জন্য কাজ কম হয়। ছাত্রবান্ধব হতে হলে ছাত্র সংগঠনগুলোর কী করা উচিত?
নাছির উদ্দীন: আমরা যেমন দলের হয়ে কাজ করি, তেমনি ছাত্রদের জন্যও কাজ করছি। গত ১৭ বছরে অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চেষ্টা করেছি। ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা ছিল। গত এক বছরে আমরা শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবিক কাজ করছি—হল ও ক্লাসরুমের পরিবেশ উন্নয়ন, খাবারের মান বৃদ্ধি, দাবিদাওয়া পূরণে সচেষ্ট। প্রত্যাশার তুলনায় কম হলেও, সুযোগ পেলে আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারব।
প্রবা: এই এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের কোন দিকগুলো দুর্বল ও কোন দিক সফল বলে মনে করেন?
নাছির উদ্দীন: সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো শহিদদের তালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি, পরিচয় শনাক্ত হয়নি, ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত হয়নি। ৪ হাজারের বেশি দৃষ্টিশক্তিহীন, ২৮/৩০ হাজার আহত মানুষ এখনো বিচার ও পুনর্বাসনের বাইরে। বিচারপ্রক্রিয়া ধীরগতি।
আর সফলতার প্রশ্নে বলব, এ সরকার আমাদের সকলের সরকার সফল করতে হলে আমাদের সবার সহযোগিতা দরকার। আমরা তা করতে প্রস্তুত।
প্রবা: আপনাকে ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।
নাছির উদ্দীন: আপনাকেও ধন্যবাদ।