কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ০৮:৫২ এএম
যারা কখনও সাবস্টেশনে যাননি, সিস্টেম অপারেশন বোঝেন না, বিদ্যুৎ গ্রিড চালানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা নেইÑ সেই তারাই এখন কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের হাল ধরছেন। অন্যদিকে ২৫-৩০ বছর ধরে মাঠে ঘাম ঝরানো প্রকৌশলীরা নেতৃত্বের চেয়ারে বসার সুযোগ পাচ্ছেন না। শুধু একটাই কারণ তাদের ‘ম্যানেজমেন্ট অভিজ্ঞতা’ নেই! বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক সম্প্রতি জারি করা একটি নতুন পরিপত্র এই বৈষম্যের ভিত্তি তৈরি করেছে। ফলে পেশাদার প্রকৌশলীদের জন্য কোম্পানির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দরজা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ঘিরে প্রকৌশলীদের মাঝে এ ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি ২০ বছর মাঠে কাজ করার পরও মাত্র ব্যবস্থাপনা পদে পাঁচ বছর অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে আমরা এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
২০২৫ সালের জুনে বিদ্যুৎ বিভাগ যে পরিপত্র জারি করেছে, সেখানে বলা হয়েছে কোনো বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হতে হলে সংশ্লিষ্ট খাতে ২০ বছরের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ‘নির্বাহী পরিচালক (ইডি)’ বা সমমানের পদে অন্তত ৫ বছরের ‘ম্যানেজমেন্ট অভিজ্ঞতা’ থাকতে হবে। প্রকৌশলীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর উচ্চপদে প্রকৌশলীদের বসানো হয় খুবই কম। বেশিরভাগ সময় প্রশাসনিক ক্যাডার থেকে আগত আমলারা এই পদগুলো দখল করে রাখেন। ফলে প্রকৌশলীরা বছরের পর বছর কাজ করেও ইডি বা জিএম পদে উঠতে পারেন না। আর যেহেতু এমডি হতে ইডি পদে অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত, তাই প্রকৌশলীরা সেই ‘যোগ্যতার’ ঘাটতিতে ছিটকে পড়ছেন। অন্যদিকে ফিল্ডে কখনও পা না রেখেও, শুধু প্রশাসনিক পরিচয় থাকার কারণে অনেকেই সহজে হয়ে যাচ্ছেন কোম্পানির এমডি।
এই নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো পূর্বের নিয়মে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন বা বিতরণ খাতে অন্তত ৫ বছরের ‘কারিগরি অভিজ্ঞতা’ বাধ্যতামূলক ছিল। এখন তা বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে হিসাব বা প্রশাসনিক বিভাগে কাজ করা কর্মকর্তা, যাদের প্রকৌশল পটভূমি নেই, তারাও এমডি হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হচ্ছেন।
ডিপিডিসি, ডেসকো, নেসকো, ওজোপাডিকোসহ বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর এমডি পদে বর্তমানে যারা আছেন, তাদের প্রায় সবাই প্রশাসনিক ব্যাকগ্রাউন্ডের। এতে প্রকৌশলীদের মাঝে চরম হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ প্রকৌশলী সমিতির সভাপতি প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, যিনি কখনও সাবস্টেশনে যাননি, সিস্টেম অপারেশন বোঝেন না, তিনি কীভাবে কোম্পানি চালাবেন? এটি শুধু অন্যায় নয়, পুরো বিদ্যুৎ খাতের জন্য ভয়ংকর ঝুঁকি।
নাম প্রকাশ্য না করার শর্তে একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২০ বছর সফলভাবে মাঠে কাজ করেছি, শতকোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি, এখন শুনি আমি যোগ্য নই! কারণ আমি ইডি পদে ছিলাম না। এটা লজ্জাজনক। এই নীতি আমাদের যোগ্য স্থান থেকে ছিটকে দিয়ে সেখানে অযোগ্য লোকদের বসানো হচ্ছে। এটাতে কোনো পরিবর্তন না এলে আমরা আমাদের এতদিনের প্রাপ্য স্থান পাব না।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, এমডি পদ কেবল প্রযুক্তিগত নয়, প্রশাসনিক ও কৌশলগত নেতৃত্বেরও জায়গা। তাই আমরা ম্যানেজমেন্ট অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। এই বিতরণ কোম্পানিগুলোর জন্মই হয়েছিল স্বশাসন ও পেশাদার নেতৃত্বের ভিত্তিতে। এসব প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্র ও নীতিমালায় ‘কারিগরি দক্ষতা’ ও ‘পেশাদারিত্ব’র ওপর জোর দেওয়া হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। কোম্পানির অপারেশনাল নেতৃত্বে এখন প্রকৌশলীর সংখ্যা একেবারেই কম, আর প্রশাসনিক ক্যাডারের দাপট অনেক বেশি।
এই যুক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন প্রকৌশলীরা। একজন বলেন, যিনি বছরে শতকোটি টাকার প্রকল্প পরিচালনা করেন, যে ২০০-৩০০ কর্মীকে পরিচালনা করেন। তিনি কি ম্যানেজার নন? শুধু চেয়ারে না বসার কারণে তার অভিজ্ঞতাকে অযোগ্য বলা যাবে না। প্রকৌশলীরা বলছেন, নেতৃত্ব শুধু চেয়ার নয়, এটা বোঝার বিষয়। আমলারা ফাইল বোঝেন, আমরা ফিল্ড। এই বার্তাই এখন রাষ্ট্রের কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়ার কথা। কারণ প্রযুক্তিনির্ভর খাতে প্রযুক্তিবিদদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা কেবল যৌক্তিক নয়, এটি এখন রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পূর্বশর্ত।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি এবং শিগগিরই এ-সংক্রান্ত গাইডলাইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে।
জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, প্রফেশনাল প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্যই প্রফেশনাল লোকদের দিয়ে পরিচালিত হওয়া উচিত। এটি একটি মৌলিক বিষয়, যেখানে কোনো আপসের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত জনকল্যাণ নিশ্চিত করতেই হওয়া উচিত, কিন্তু ফ্যাসিবাদের আমলে যে সিস্টেম চালু হয়েছিল, সেই ধারা এখনও বজায় রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্যই ছিল এই সিস্টেম ভাঙা, কিন্তু তা এখনও পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। তাই এই সিস্টেম বদলাতে হলে আবারও আমাদের আন্দোলনে নামতে হবে।