হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৫ ১০:০৯ এএম
আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৫ ১০:১৫ এএম
ফাইল ফটো
দেশের আট বিভাগের প্রায় সব জেলাতেই চোখ রাঙাচ্ছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাস বা ডেঙ্গু জ্বর। ইতোমধ্যে দেশের ৬০ জেলাতে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু জ্বর। প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা, মৃত্যুও। বিগত জুন মাস থেকেই ডেঙ্গুর প্রকোপ উচ্চ হারে বাড়তে শুরু করেছে। জুলাইয়ে এসে সেই মাত্রা নিয়েছে ভয়াবহ আকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে এ বছরের জুন মাসে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ৯৫১ জন, জুলাই মাসে আক্রান্ত হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৪ জন। গত জুনে মারা গেছে ১৯ জন এবং জুলাই মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৪১ জনের। যা গত বছরের (২০২৪-এর জুনে ৭৯৮ জন এবং জুলাইয়ে ২ হাজার ৬৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি জুনে মারা যায় ৮ জন এবং জুলাইয়ে ১২ জন) তুলনায় অনেক বেশি।
ডেঙ্গুর এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা, অযত্নে পড়ে থাকা পাত্রে পানি জমে থাকা ও সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে মশার প্রজনন দ্রুত বাড়ছে। তারা বলছেন, এডিস মশার বিস্তার ঠেকাতে স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এ পরিস্থিতিতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাবে। আর তা হলেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আর তাই ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে ঠিক সময়ে পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, রোগ দ্রুত শনাক্ত হলে সুস্থতার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছেÑ ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে। ডেঙ্গু এখন আর আগের মতো সহজভাবে মোকাবিলা করার পর্যায়ে নেই।
দেশের আট বিভাগের ডেঙ্গু সংক্রান্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান এবং দেশের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদক ও সংবাদদাতাদের পাঠানো প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছেÑ এ বছর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে বরিশাল বিভাগে। হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যাও এখন পর্যন্ত এ বিভাগেই সবচেয়ে বেশি। এর পরেই যথাক্রমে আছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, ময়মনসিংহ, রংপুর এবং সিলেট বিভাগ। তবে মৃত্যু বেশি ঢাকা বিভাগে এবং এর পরের স্থানগুলোতে আছে বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী এবং ময়মনসিংহ বিভাগ। সিলেট বিভাগে এখন (গতকাল) পর্যন্ত কেউ মারা যায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকাল শুক্রবারের তথ্য বলছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল আগস্ট মাসের প্রথম দিনের সকাল ৮টা পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৭৯৯১ জন। ঢাকা বিভাগে চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত ৭০৯৫ জন, এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ২ হাজার ৫২৮ জন আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১ হাজার ৬৮৯ জন এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২ হাজার ৮৭৮ জন। আর, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩০৩০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৫২০ জন, খুলনা বিভাগে ১০১৮ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩১০ জন, রংপুর বিভাগে ১০৮ জন এবং সিলেট বিভাগে ৪৫ জন।
এ বছরের শুরু থেকে গতকাল আগস্টেও প্রথম দিনের সকাল ৮টা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৩৭ জন, উত্তর সিটিতে ৯ জন এবং ঢাকা মহানগরের বাইরে ১ জন। ঢাকা বিভাগের পরেই আছে বরিশাল বিভাগ। এ বিভাগে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত মারা গেছে ১৬ জন। এর পরে আছে যথাক্রমে চট্টগ্রাম বিভাগ (১২ জন), খুলনা বিভাগ (৪ জন), রাজশাহী বিভাগ (৩ জন) এবং ময়মনসিংহ বিভাগ (১ জন)। সিলেটে এখন পর্যন্ত কেউ এ রোগে মারা যায়নি। এ হিসাব অনুযায়ী গেল বছরের তুলনায় এই বছর জুলাইয়ে রোগী বেড়েছে সাড়ে ৪ গুণের কিছু বেশি এবং মৃত্যু বেড়েছে ৩ দশমিক ৪২ গুণ।
এবারের ডেঙ্গু সংক্রান্ত এ পরিস্থিতির বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন আর আগের মতো সহজভাবে মোকাবিলা করার অবস্থায় নেই। ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে। এখন রোগীদের মধ্যে জটিল উপসর্গ বেশি দেখা যাচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ডেঙ্গু থেকে উত্তরণে করণীয় বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন জানান, ডেঙ্গু ও করোনার চিকিৎসায় দেশে অভিজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। কিন্তু আমাদের সবকিছু এক-কেন্দ্রীভূত। সুতরাং এর বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। যদি প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার থাকে, টেস্টের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে রোগী দ্রুত শনাক্ত করা যায়। রোগী দ্রুত শনাক্ত হলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
বরিশাল বিভাগে কেন ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি
প্রতিদিনের বাংলাদেশের বরিশাল প্রতিবেদক শাকিল মাহমুদের পাঠানো প্রতিবেদনে বলছে, বরিশাল বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুর প্রকোপ বরগুনায়। বরগুনা পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে পাঁচটি ওয়ার্ডই ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। এখানে লার্ভার ঘনত্ব স্বাভাবিকের তুলনায় সাড়ে ৮ গুণ বেশি পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আইইডিসিআর বলছে, বরগুনায় ডেঙ্গুর ডেন-৩ ও ডেন-২ সোরোটাইপের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।
বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুর প্রকোপ কেন বেশি, এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়নকারী রফিকুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বরিশালে হঠাৎ করে এডিস মশা বৃদ্ধির বেশ কিছু কারণ আছে। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলোÑ অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নগরায়ণ। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপে এবং নির্মাণাধীন বাড়ি ও স্থাপনায় পানি জমে থেকে এডিস মশার বংশ বৃদ্ধি হচ্ছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর বেশ কিছু উন্নয়ন কাজ অর্ধেক অথবা কোনোরকম শুরু হওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেছে। সেসব জায়গায় পুরোপুরি কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় সেখানে পানি জমে মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। এ ছাড়াও বড় সমস্যা হচ্ছে নগরীর মধ্যের খাল ও ড্রেনগুলো পরিষ্কার না করা। ফলে বদ্ধপানিতে এডিস মশা তার বংশবিস্তার করছে।
তিনি বলেন, ‘এসব বিষয় নিয়ে শুধু প্রশাসন আর সরকারকে দায় চাপালে চলবে না। সবার আগে নিজেদের সচেতন হতে হবে। আমরা বিভিন্ন সময় প্রচারণা চালিয়েছি। বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নিয়ে কাজ করেছি। তবে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দেখা দিচ্ছে না। ফলে এখন ডেঙ্গুর রেড জোন হিসেবে তৈরি হয়েছে বরিশাল।’
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে নির্দেশনা দেওয়া আছে। বিভাগের সবগুলো হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন রোগীরা। তিনি বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিভাগের মধ্যে বরগুনায়। এখানে যেমন ঘনবসতি রয়েছে ঠিক তেমনি আগে থেকেই এডিস মশা ছিল। এ ছাড়া একই মশা আক্রান্ত ও সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ানোর কারণে এই রোগটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
ডেঙ্গু ছড়িয়েছে দেশের ৬০ জেলায়, চার জেলায় ডেঙ্গু নাই : দেশের ৬০ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। শুধুমাত্র চারটি জেলায় এই বছর এখন পর্যন্ত কোনো ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়নি। জেলাগুলো হলোÑ গোপালগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, জয়পুরহাট এবং সুনামগঞ্জ। তবে সংক্রমণের হার অর্থাৎ ডেঙ্গু রোগী বেশি পাওয়া গেছে দেশের ১০ জেলায়। তার মধ্যে পাঁচটি উপকূলীয় জেলা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছেÑ ঢাকাসহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা, গাজীপুর ও চাঁদপুর এবং উপকূলের পাঁচ জেলাÑ কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বরগুনা, বরিশাল, পটুয়াখালীতে রোগীর সংখ্যা বেশি। ডেঙ্গু আক্রান্তের ৭৯ শতাংশ ও মৃত্যুর ৮৭ শতাংশ হয়েছে এসব জেলায়। উপকূলের পাঁচ জেলায় আক্রান্ত ৪৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং মৃত্যু ৪১ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের গবেষণা ফোরকাস্টিং মডেল অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে বরগুনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, কক্সবাজার, গাজীপুর, পিরোজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর ও মাদারীপুরে ডেঙ্গু ব্যাপক হারে বিস্তার লাভ করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘গড়ে প্রতিদিন প্রায় দুই শতাধিকেরও বেশি নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। কারণ অনেকেই বাসায় বা অনিবন্ধিত ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছেন, যাদের তথ্য সরকারিভাবে নথিভুক্ত হয় না। এই পরিসংখ্যানগুলো এক গভীর সংকটের দিকেই ইঙ্গিত করছে, পরিস্থিতি যদি এখনই সমাধানে না আনা যায়, তাহলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।’
###