আউটসোর্সিং ই-পাসপোর্ট সেবা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৫ ১০:৩৯ এএম
আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৫ ১০:৪১ এএম
আউটসোর্সিং ই-পাসপোর্ট সেবার নামে দেশের নাগরিকদের তথ্য তৃতীয় পক্ষ তথা স্বার্থান্বেষীদের কাছে চলে যাচ্ছে। সেবার নামে শুধু দেশে নয়, বিদেশি দূতাবাসেও গড়ে উঠেছে আউটসোর্সিং ঠিকাদারের সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাধ্যমে পাসপোর্ট করতে আসা নাগরিকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আগে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) সেবা আউটসোর্সিং কোম্পানির মাধ্যমে ঝুঁকি না থাকলেও চলমান ই-পাসপোর্টের ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নাগরিকদের তথ্য পাচার হওয়ার আশঙ্কার আছে। প্রবাসীরা বিগত সরকারকে অবগত করলেও আমলে আনা হয়নি। প্রবাসীদের পাসপোর্ট সেবার নামে অতিরিক্ত ফি যেমন গুনতে হচ্ছে, তেমনি দেশও হারাচ্ছে রেমিট্যান্স।
বিদেশি একটি কোম্পানিকে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে ই-পাসপোর্ট সেবা অব্যাহত রাখা হয়। এই কোম্পানির সঙ্গে বিগত সরকারের প্রভাবশালীরা যোগসাজশ ছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। অর্থের বিনিময়ে বিদেশি চক্র নাগরিকদের তথ্য হাতিয়ে নিয়ে নানাভাবে হয়রানি করছে। এমন তথ্য সরকারের শীর্ষ মহলে জানানো হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঠিকাদারদের মাধ্যমে ই-পাসপোর্ট সেবা দিতে চায় না। এটি বাতিল করে নাগরিকদের ই-পাসপোর্ট সেবা সহজ করার কর্মপরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে সরকার। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র বলছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়াধীন ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিপ্তরের অধীনে দেশে ও বিদেশে থাকা নাগরিকদের ই-পাসপোর্ট দেওয়া হয়। এটি স্পর্শকাতর হওয়া সত্ত্বেও বিগত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ব্যয় সংকোচনের নামে অন্যান্য বিভাগের মতো ঠিকাদারি কোম্পানির মাধ্যমে ই-পাসপোর্ট সেবা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ঠিকাদার কোম্পানি নিয়োগ করে। সেবার নামে বাড়তে থাকে ব্যয়। পরবর্তীতে এই কার্যক্রম মাফিয়া চক্রের খপ্পরে চলে যায়। এতে দেশে-বিদেশে পাসপোর্ট সেবা পেতে আসা নাগরিকদের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। অভিযোগ উঠলেও ঠিকাদারি কোম্পানির মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের কিছুই হয় না। আউটসোর্সিং কোম্পানিগুলো নিজেদের আত্মীয়স্বজনকে কোম্পানিতে নিয়োগ প্রদান করে, ফলে দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও জবাবদিহিতার আওতায় জনবল নিয়োগ করা সম্ভব হয় না। এর ফলে ই-পাসপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাটি সবসময় হুমকির মধ্যে থাকে। অতীতে বিভিন্ন কোম্পানিকে আউটসোর্সিং সেবা প্রদান করা হয়েছিল। তারা বিভিন্ন অনিয়ম করেছিল। একই ব্যক্তিকে ফিঙ্গার জালিয়াতির মাধ্যমে একাধিক পাসপোর্ট প্রদান, বিভিন্ন মানুষের কাছে থেকে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে। এক্ষেত্রে সৌদি আরবে আইরিশ কোম্পানির বিষয়টি অন্যতম। আউটসোর্সিং কোম্পানিগুলো অনেক ক্ষেত্রে যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে টাকা-পয়সা জমা দেয় না এবং প্রবাসীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে থাকে।
ই-পাসপোর্টের কর্তৃত্ব আউটসোর্সিং কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় হাজার হাজার প্রবাসী কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। ফলে কোম্পানির কর্মচারীরা ঘুষ বাণিজ্য গড়ে তোলে এবং প্রবাসীরা দুর্ব্যবহারের শিকার হয়। সেবা নিতে একজন প্রবাসীকে কয়েকবার তাদের অফিসে যাতায়াত করতে হয়। প্রবাসীদের সরকার নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত ফি সেবা গ্রহণের জন্য আউটসোর্সিং কোম্পানিকে প্রদান করতে হয়। এতে লাখ লাখ প্রবাসীর বিপুল অঙ্কের টাকা কোম্পানির হাতে চলে যাচ্ছে। অতিরিক্ত সেবা ফি আউটসোর্সিং কোম্পানিকে প্রদানের ফলে দেশ রেমিট্যান্স হারাচ্ছে। আউটসোর্সিং কোম্পানিদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট থাকায় অনেক সময় দূতাবাসও তাদের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। আউটসোর্সিং কোম্পানিতে সরকারের কোনো অথোরাইজড অফিসার না থাকার ফলে এবং সব কর্মচারী কোম্পানির নিজস্ব লোক হওয়ায় পাসপোর্টের মতো স্পর্শকাতর বিষয়টি যথাযথভাবে মনিটরিং করা সম্ভব হয় না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ই-পাসপোর্ট সেবা আউটসোর্সিং কোম্পানিকে প্রদান করতে হলে সরকারি অর্থে ক্রয় করা কোটি টাকার মেশিন এবং গুরুত্বপূর্ণ সার্ভারসহ জনগণের সব তথ্য তাদের অফিসে প্রদান করতে হয়। এতে একটা বিরাট ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। এমআরপি সেবা আউটসোর্সিং কোম্পানিকে প্রদান করলে তেমন ঝুঁকি থাকে না। কিন্তু ই-পাসপোর্ট সেবাটি আউটসোর্সিং কোম্পানিকে প্রদান করলে বরাবরই ঝুঁকি থাকে। কেননা দুটি সেবার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ই-পাসপোর্ট সেবাটি আউটসোর্সিং কোম্পানিকে প্রদান করলে দূতাবাস ও আউটসোর্সিং কোম্পানির মধ্যে অনেক সময় টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। ই-পাসপোর্ট সেবাটি আউটসোর্সিং কোম্পানিকে প্রদানের ফলে তারা ইচ্ছেমতো যে কাউকে পাসপোর্ট প্রদানের জন্য এনরোলমেন্ট করতে পারে। আউটসোর্সিং কোম্পানির পরিবর্তে দূতাবাস হতে পাসপোর্ট সেবা প্রাপ্তিতে প্রবাসীরা অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ প্রকাশ করে। দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় তারা জবাবদিহিতার আওতায় থাকে এবং মানুষকে সেবা প্রদানে অনেক বেশি আন্তরিক থাকে। কিন্তু কোম্পানির ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়।
প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত সব তথ্যই থাকে পাসপোর্টে। ভোগান্তি ও হয়রানি কমাতে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) পরিবর্তে ই-পাসপোর্ট চালু হয়। কিন্তু আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে ঠিকাদারের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য পাচারের আশঙ্কা তৈরি হয়। গড়ে ওঠে বিশেষ সিন্ডিকেট। তাদের মাধ্যমেই ঘুষ, জাল পাসপোর্ট তৈরিসহ নানা অপরাধের ক্ষেত্রও বাড়তে থাকে। ফলে আউটসোসিং কোম্পানির সঙ্গে করা চুক্তি আশীর্বাদ মনে হলেও পরবর্তীতে অভিশাপে পরিণত হয়। সম্প্রতি সরকারের একটি পর্যবেক্ষণে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন দূতাবাসে সংশ্লিষ্ট দেশে থাকা ই-পাসপোর্ট থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সহজে পাচার হচ্ছে। এসব তথ্য বাংলাদেশ বিরোধী চক্রের কাছে চলে যাওয়ায় নাগরিকরা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন। অধিকাংশ ই-পাসপোর্টধারী নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে। আর নেপথ্যে ই-পাসপোর্ট সেবায় আউটসোর্সিং বা বেসরকারিভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোকেরা জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর ই-পাসপোর্ট আউটসোর্সিং সেবার নামে হয়রানি ও ব্যক্তিগত তথ্য পাচারের আশঙ্কার কথা জানিয়ে সরকারের কাছে আবেদন করে প্রবাসীরা। তাদের অভিযোগ আমলে নিয়ে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের আগস্টে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় সিদ্ধান্ত হয়। সে প্রেক্ষিতে সরকারের হাইকমিশনগুলো কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য একগুচ্ছ কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়। বলা হয়, হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা, সেবা প্রত্যাশীদের সঙ্গে অসদাচরণের মতো বিষয়গুলো হাইকমিশন গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবে। প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বলা হয়, হাইকমিশনের বিদ্যমান জনবল দিয়ে লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীদের ই-পাসপোর্ট সেবা দেওয়াটা চ্যালেঞ্জ।
প্রবাসীদের দাবির প্রেক্ষিতে আগের এমআরপি (মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট) পরিবর্তে ই-পাসপোর্ট সেবা চালু করা হয়। ২০২৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আউট সোর্সিং কোম্পানি ইএসকেএলের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বলা হয়, দালালমুক্ত পাসপোর্ট পরিষেবা নিশ্চিত করতে ই-পাসপোর্টের আবেদন ফরম পূরণ, পাসপোর্ট ফি জমা, ছবি তোলা, বায়োমেট্রিক গ্রহণসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দ্বারা অনুমোদনের আগ পর্যন্ত সব কার্যক্রম আউট সোর্সিং কোম্পানি ইএসকেল সম্পন্ন করবে। সেদিন থেকেই মূলত ই-পাসপোর্ট সেবা কাযৃক্রম শুরু হয়। কিন্তু আউটসোর্সিং ঠিকাদারি কোম্পানি সরকারের চুক্তির শর্ত তোয়াক্কা না করে নিজেদের মতো কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।