ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও সাইফ বাবলু
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৫ ১৫:৫৬ পিএম
সামাজিক মাধ্যমে অপরিচিত বা স্বল্পপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ না হওয়ার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। সরকার-সংশ্লিষ্টরা মনে করছে, সরকারি কর্মকর্তারা অতিমাত্রায় সামাজিক মাধ্যমে সরব থাকার সুযোগে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন প্রতারক চক্র ফাঁদ পাতছে। আর এসব ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন অনেকে। পাশাপাশি তাদের জিম্মি করে রাষ্ট্র ও সরকারের স্পর্শকাতর অনেক গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পরে এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে। তার বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচ্ছে ওই চক্র। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে সরকারি কর্মকর্তাদের সামাজিক মাধ্যম তথা ফেসবুকে তাদের ছবি-নাম-পদবি ব্যবহার না করে আরও দায়িত্বশীল হতে বলা হয়েছে। অতিসম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ছবি, নাম ও পদবি ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া আইডি খুলে প্রতারণার ঘটনা নতুন নয়। সম্প্রতি একটি সংঘবদ্ধ চক্র নতুন করে পুরনো এ প্রতারণা শুরু করেছে। শুধু তাই নয়Ñ হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ও এক্সসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের আইডিও এখন হ্যাক করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পুলিশের পদস্থদের নাম ও ছবি ব্যবহার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি রয়েছে ভিন্ন চিত্রও। ইতোমধ্যে কয়েকজন ডিসি, ইউএনও, পুলিশ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তার নারীঘটিত কেলেঙ্কারি, ঘুষ লেনদেনের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। এসব ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে সরকারকে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। সেই সঙ্গে কর্মকর্তারাও পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছেন।
অতীতে রাজনৈতিক সরকারের আমলে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ওই চক্রের তৎপরতা বেড়ে গেছে অনেক। গত এক বছরে বেশ কয়েকটি ঘটনায় বিতর্ক ও শোরগোল তৈরি হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটেই সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের অতিমাত্রায় সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্র। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পাঠানো চিঠিতে পুলিশ সদর দপ্তর, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (এমটিএমসি) এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনি ইতোমধ্যেই নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি বা গোষ্ঠি ও বৈরী গোয়েন্দা (একটি বিদেশি) সংস্থার বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ থেকে নিরাপদ থাকতে বেশকিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতারণামূলক ফাঁদ এড়াতে অধিকতর সাবধানতা অবলম্বনের ক্ষেত্রে পরামর্শ দিতে হবে। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। চিঠিতে আরও বলা হয়, এ ধরনের অপরাধের তথ্য পেলে দেশের গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত সময়ের মধ্যে অবগত করতে হবে। যাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে তাদের পরিচয়, পদবি, অবস্থান, দৈনন্দিন কার্যক্রম প্রকাশ না করার বিষয়ে সতর্ক থাকা আবশ্যক। কোনো ধরনের প্রলোভনমূলক ভিডিও কল, ছবি বা চ্যাটের ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন। অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া যাবে না। অনলাইন চ্যাট বা ভিডিও কলে কোনো গোপন তথ্য, ছবি বা ভিডিও শেয়ার করা যাবে না। এ বিষয়ে বিশেষ সতর্ক হতে হবে কর্মকর্তাদের।
জানা গেছে, সম্প্রতি কয়েকজন ডিসি, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কয়েকজনকে প্রতারণার মাধ্যমে ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক মাধ্যমে সেগুলো ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে; যা সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। গোটা জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মূলত সুন্দরী নারীদের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের ফাঁদে ফেলে তাদের কাছ থেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আর এসব কাণ্ডে দেশীয় নানা প্রতারক চক্রকে ব্যবহার করছে বিদেশি ওই গোয়েন্দা সংস্থা। তাদের পেছনে মোটা অঙ্কের টাকাও বিনিয়োগ করছে। অনেকেই টাকার প্রলোভনে পড়ে দেশের স্পর্শকাতর তথ্য বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তুলে দিচ্ছেন।
একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ইদানীং প্রযুক্তির মাধ্যমে সুকৌশলে বিচারক, সচিব, ডিসি, ডিআইজিসহ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মোবাইল নম্বর ক্লোন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, গুরুত্বপূর্ণ ওইসব কর্মকর্তার নাম-ছবি ব্যবহার করে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খুলে বা হ্যাক করে ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। করা হচ্ছে অনৈতিক তদবিরও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচারকদের ফোন করে দাগী অপরাধীদের জামিন দেওয়ারও অপচেষ্টা করা হচ্ছে। আবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কথা বলে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে দান-অনুদান। এমন ঘটনায় ইতোমধ্যে একাধিক চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বেশ কয়েকটি মামলাও হয়েছে। তারপরও প্রতারণা থামছে না।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বিষয় সংক্রান্ত ছবি বা ভিডিও এখন হরহামেশাই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। অনেক কর্মকর্তার নামে ফেক আইডি খুলে প্রতারণা হচ্ছে। চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। শুধু সিভিল প্রশাসন নয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পদস্ত কর্মকর্তাদের নামেও ভুয়া আইডি খোলার অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের একটি গোয়েন্দা সংস্থার অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সামাজিক মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। আবার অনেক কর্মকর্তা নিজের অজান্তে নারীঘটিত কেলেঙ্কারিতে জড়ানোর ভিডিও বা ছবি ভাইরাল হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, উপসচিব, অতিরিক্ত সচিব এবং বিভিন্ন দপ্তরের পদস্থ কর্মকর্তাÑ কেউই বাদ যাচ্ছেন না। আবার অনেক সরকারি কর্মকর্তার নামে ভুয়া আইডি খুলেও রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ভাইরাল করা হচ্ছে। অনেক সময় এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কারসাজি থাকে। হয়তো সে কারণে সরকারি কর্মকর্তাদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার জন্য বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে এর আগেও পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শুধু পুলিশই নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জড়িত অন্যান্য বাহিনীর সদস্যের ক্ষেত্রেও এমন নির্দেশনা দেওয়া আছে। তারপরও দেখা যায়, কোনো কোনো কর্মকর্তা বাহিনীর অনেক গোপন কর্মকাণ্ড সামাজিক মাধ্যমে দিচ্ছেন। এতে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচার হয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সব পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।