আরমান হেকিম
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৫ ০৮:৫৪ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক কমাতে একাধিক ধাপে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ, কিন্তু আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক, নিরাপত্তাজনিত বা আইনি সংস্কারমূলক কিছু অ-বাণিজ্যিক শর্ত যেগুলো মেনে নিতে রাজি নয় ঢাকা। তবে শুল্ক কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে প্রস্তুত বাংলাদেশ।
এই অবস্থার মধ্যেই গত সোমবার সচিবালয়ে উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ও সম্ভাব্য চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে কৃষি, বাণিজ্য, শিল্প, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা, খাদ্য, পররাষ্ট্রসহ এক ডজনের বেশি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্ত হয়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন কৃষিপণ্য, বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ, এলএনজি ও সামরিক সরঞ্জাম আমদানির পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ই-মেইল পাঠিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরুর জন্য রবিবার সময় চেয়েছে। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থানপত্র পাঠানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ কী কী বিষয়ে একমত হতে পারবে, সেগুলো অবস্থানপত্রে বলা হয়।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক হ্রাসে বাংলাদেশের রপ্তানি সুবিধা পেতে হলে আমদানি বাড়ানো, সরকারি কেনাকাটায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ এবং আইপি প্রোটেকশন আইন সংস্কারের মতো বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
তবে তিনি বলেন, ‘অ-বাণিজ্যিক কোনো শর্তে আমরা রাজি নই। বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়া হবে। কিন্তু নিরাপত্তা বা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কোনো শর্তে ঢাকা যাবে না।’
ভিয়েতনামের মডেল তুলে ধরা হয় বৈঠকে
বৈঠকে কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্র-ভিয়েতনাম বাণিজ্য সম্পর্কের উদাহরণ দেন। ভিয়েতনাম ১২২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাড়িয়ে পাল্টা শুল্ক ৪৬ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশের লক্ষ্যও শুল্কহার ২০ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনা, যদিও এটা নির্ভর করছে আলোচনার ফলাফলের ওপর।’
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত চুক্তির খসড়ার আলোকে আমরা মঙ্গলবার ইউএসটিআরকে বাংলাদেশের অবস্থানপত্র পাঠিয়েছি। পাশাপাশি আগামী সপ্তাহে বৈঠকের নির্দিষ্ট সময় চেয়ে চিঠিও দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের অনুরোধ অনুযায়ী তারা যদি বৈঠকের সময় নির্ধারণ করে, আমরা সেই অনুযায়ী যাব। না হলে যুক্তরাষ্ট্র যখন সময় দেবে, তখনই যাব।’
তিনি জানান, ইউএসটিআর তাদের কাছ থেকে সময় না নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে নিরুৎসাহিত করছে। কারণ হচ্ছে, আলোচনা করতে ইউএসটিআরের অনেক লোক নিয়ে বসতে হয় এবং তাদের একটা প্রস্তুতির ব্যাপার থাকে।
তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ প্রস্তাব ১৯৪৯ সালের পর এই প্রথম। অতীতে উন্নত দেশগুলো গরিব দেশগুলোকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিত। এই ধারা বদলে গেছে। এখন দুই দেশকেই ছাড় দিতে হচ্ছে।’
বৈঠক সূত্র জানায়, কৃষি মন্ত্রণালয় সম্মতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন, ডাল, তৈলবীজ, চিনি ও বার্লি আমদানিতে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বছরে ৭ লাখ টন গম আমদানির জন্য চুক্তি করেছে।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষিতে শুল্কের বাইরেও বিভিন্ন অশুল্ক বিষয় রয়েছে। এখানে শুধু অর্থনীতি না, এর সঙ্গে রাজনৈতিক-অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি জড়িত রয়েছে। ফলে এটিকে যারা শুধু একটা শুল্ক সমস্যা হিসেবে দেখেন, তারা ঠিক দেখছেন না।’
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে দর-কষাকষিতে সেবা খাতের বিষয়টি একদমই সামনে আনা হয়নি। উপদেষ্টা থেকে শুরু করে অন্য যারা দর-কষাকষির সঙ্গে যুক্ত আছেন, তাদের মুখে এটি নিয়ে কোনো কথা নেই। অথচ এই সেবা খাতের সঙ্গে আমাদের তৈরি পোশাক, ওষুধ ও অন্য রপ্তানি খাতও জড়িত।’
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ও প্রতিবেদন
২ এপ্রিল প্রকাশিত ইউএসটিআরের ২০২৫ ন্যাশনাল ট্রেড এসটিমেট রিপোর্টে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সরকারি ক্রয় খাতে ঘুষ-দুর্নীতি, দরপত্রে অস্বচ্ছতা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো সরকারি দরপত্রে অংশ নিতে বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ দরপত্রের শর্তাবলি তাদের অনুপযোগী করে তৈরি করা হয়। বিদেশি প্রতিযোগীরা স্থানীয় অংশীদারদের ব্যবহার করে প্রভাব খাটায়, বিড রিগিং ও ঘুষের ঘটনা ঘটে।
তথ্য সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে। এনক্রিপশন ভেঙে ট্রেসযোগ্যতা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা, ২০১৫ সাল থেকে ঘন ঘন ইন্টারনেট বন্ধ এবং ডিজিটাল ব্যবসায়িক নীতির দুর্বলতা মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রতিবন্ধক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মার্কিন বিনিয়োগে জটিলতা কমানোর উদ্যোগ
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সরকারি ক্রয় বিধি সংশোধন করে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে। মুনাফা ও লভ্যাংশ ফিরিয়ে নেওয়াসহ এক্সটার্নাল পেমেন্ট সংক্রান্ত জটিলতা কমাতে নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিশেষ করে, মার্কিন কোম্পানিগুলোর নির্দিষ্ট কোনো সমস্যার সমাধানে কেস-টু-কেস ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। তবে শর্ত হচ্ছে, এসব হতে হবে একান্তই বাণিজ্যিক পরিসরে।
আইপি ও জিআই সুরক্ষা নিয়ে দ্বিধা
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কাছে চায় আন্তর্জাতিক মানের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (আইপি) ও জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। শিল্প মন্ত্রণালয় জানায়, ভারতসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখনও শতভাগ মানতে পারে না। তাই বাংলাদেশও ধাপে ধাপে এই সুরক্ষা কার্যকর করবেÑ এমন অঙ্গীকারই দেওয়া হবে।
চুক্তির পরবর্তী ধাপ
চূড়ান্ত আলোচনায় দু’দেশ একমত হলে খসড়া চুক্তি উপদেষ্টা পরিষদ ও আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন শেষে স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হবে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী সাড়া ও আলোচনার গতি-প্রকৃতির ওপর।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানির বিপরীতে বছরে ৬৪৮ কোটি টাকার শুল্ক পায়। এই শুল্ক ছাড় দিতে সরকার রাজি হলেও এর বিনিময়ে এমন কোনো শর্ত মেনে নিতে নারাজÑ যা দেশের নীতিগত অবস্থান, তথ্য নিরাপত্তা বা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শুল্ক কমাতে হলে শর্তও হতে হবে শুধুই বাণিজ্যিক, অ-বাণিজ্যিক কোনো চাপ নয়, এই বার্তাই দিতে চায় ঢাকা।