× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পূর্বাচলের নতুন শহর গড়ে ওঠেনি তিন দশকেও

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৫ ১৩:১০ পিএম

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৫ ২০:৫৬ পিএম

রাজধানী ঢাকার পূর্বপাশে পূর্বাঞ্চল নতুন শহর প্রকল্পে ফাঁকা পড়ে আছে সব প্লট। ছবি: আরিফুল আমিন

রাজধানী ঢাকার পূর্বপাশে পূর্বাঞ্চল নতুন শহর প্রকল্পে ফাঁকা পড়ে আছে সব প্লট। ছবি: আরিফুল আমিন

৩০ বছর কেটে গেল। তবু গড়ে ওঠেনি রাজধানীর পাশে প্রতিশ্রুত ‘নতুন শহর’। ঢাকার জনসংখ্যার চাপ কমাতে পরিকল্পিত আবাসনের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা হয়েছিল পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের। যার বাস্তব রূপ এখনও অধরা। জমি বরাদ্দ হয়েছে, কিছু রাস্তা ও কাঠামো তৈরি হলেও আবাসনের কোনো চিহ্ন নেই।

১৯৯৫ সালে ঢাকার পূর্বদিকেÑ শীতলক্ষ্যা ও বালু নদের মাঝখানে রূপগঞ্জ ও কালীগঞ্জে ৬ হাজার ২১৩ একর জমিতে নতুন শহর গড়ার পরিকল্পনা নেয় রাজউক। ৩০টি সেক্টরে ভাগ করা প্রকল্পের প্রায় ৯৬ শতাংশ ভূমির উন্নয়নকাজ শেষ হয়েছে বলে রাজউক দাবি করলেও অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার চিত্র এখনও ভঙ্গুর।

তিন দশক পরও গ্যাস সংযোগ, সড়কবাতি, খেলার মাঠ, হাসপাতাল, স্কুল কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম সবই অনুপস্থিত। প্রকল্পে ৯৪টি মসজিদের জমি নির্ধারণ, ৪টি থানা ও ৬টি পুলিশ ফাঁড়ির স্থান নির্ধারিত হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। পার্ক, ফুটপাত ও কমিউনিটি স্পেস এখনও নকশাতেই সীমাবদ্ধ; পড়ে আছে খালি জায়গা। সড়কবাতি না থাকায় রাতে গোটা এলাকায় অন্ধকার নেমে আসে।

এমন পরিস্থিতিতেই পূর্বাচলের ১, ২ ও ৩ নম্বর সেক্টরে বাড়ি নির্মাণে চাপ দিচ্ছে রাজউক। চলতি বছরের মে মাসে এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ভূমি, প্লট, স্পেস ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ) বিধিমালা, ২০২৪’-এর ধারা ৯ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়ি নির্মাণ বাধ্যতামূলক। বরাদ্দগ্রহীতারা প্লটের ইজারা বা লিজ দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন করার পর পানি সরবরাহ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থায় আবেদন করতে পারবেন। বাধ্যবাধকতা না মানলে প্লট বাতিলের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাচলের ১ নম্বর সেক্টরে ৫২৯টি, ২ নম্বরে ৯০৫টি এবং ৩ নম্বর সেক্টরে ৮০৪টি আবাসিক প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের শুরু থেকেই যারা এ অঞ্চলে বসবাস করছেন, তাদের মূল আদিবাসী বলা হয়। এমন একজন স্থানীয় বাসিন্দা মফিজুল ইসলাম। পূর্বাচল প্রকল্পের ২ নম্বর সেক্টরের পশীবাজার এলাকায় তার বাড়ি। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরাও এই এলাকায় ছিলেন। পূর্বাচল প্রকল্প শুরু হলে রাজউক আমাদের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণ করে। আমাদের পাঁচ কাঠার একটি প্লট রয়েছে এখানে। ৩০ বছর কেটে গেলেও পূর্বাচল শহর হয়ে ওঠেনি। দুয়েকটি প্লটে বাড়ি উঠলেও স্কুল-কলেজ নেই, হাসপাতাল নেই, বাজার বসে না। রাতে পুরো এলাকা অন্ধকারে ছেয়ে যায়। আমাদের অসুখ-বিসুখ হলে যেতে হয় ঢাকায় কিংবা গাউছিয়ায়। পূর্বাচল জমতে আর কত বছর লাগবে, আল্লাহই জানেন।’

নাগরিক সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে বাড়ি নির্মাণে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক প্লট মালিক। পূর্বাচলের একজন প্লট মালিক রিয়াজ উদ্দিন, যিনি কয়েক বছর আগে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন, প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পূর্বাচলে বাড়িঘর করব সাহস করতে পারছি না। এখানে বাচ্চাদের জন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা স্বাস্থ্যসেবা নেই। খেলার মাঠও নেই। হয়নি থানা-পুলিশ বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা। এলাকাজুড়ে নেই সিটি করপোরেশনের কোনো নাগরিক সেবাÑ পানি সরবরাহ নেই, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই, আবর্জনা অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থাও নেই, নেই বৈধভাবে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের সুযোগ।’

পূর্বাচল নিয়ে রাজউকের সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব ও গাফিলতি ছিল বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ত্রিশ বছরেও রাজউক পূর্বাচলকে শহর হিসেবে দাঁড় করাতে পারেনি। সময়মতো অবকাঠামো উন্নয়ন হয়নি। অথচ রাজউকের চারপাশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো একচেটিয়া আবাসন ব্যবসা করেছে। এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, তা তদন্ত করে বের করা দরকার। যেকোনো আবাসিক এলাকায় মানুষের জন্য মৌলিক ইউটিলিটি সার্ভিস ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা অপরিহার্য এসব নিশ্চিত করা রাজউকের দায়িত্ব। আর প্লট মালিকরা তখনই বাড়ি বানাবেন, যখন বাসযোগ্য পরিবেশ থাকবে।’

পূর্বাচল প্রকল্পের মেয়াদ ইতোমধ্যে আটবার বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সময়সীমা ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর; পরে তা আরও ছয় মাস বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এরপর আর মেয়াদ বাড়ানো হবে নাÑ এমন ঘোষণা দিয়েছে রাজউক। সংস্থাটির দাবি, ৩৬৫ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে ৩৪৫ কিলোমিটার এবং ৫৬টি ব্রিজের মধ্যে ৫২টি ব্রিজ নির্মাণ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চিঠি দিচ্ছে সংস্থাটি।

এ প্রসঙ্গে পূর্বাচল প্রকল্পের পরিচালক এবং রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী নরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ভূমি উন্নয়ন ও সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। মানুষ যাতে বাড়িঘর তৈরি করতে পারে, সে লক্ষ্যে আমরা রাস্তাঘাট করে দিয়েছি। ডেসকোর মাধ্যমে শতভাগ বিদ্যুতায়ন করেছি। পূর্বাচল পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় ১ থেকে ৪ নম্বর সেক্টরে পানি সরবরাহ চালু হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ১৫টি সেক্টরে সম্পূর্ণ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হবে। বাকি ১৫টি সেক্টরে ওয়াসা পানি সরবরাহ করবে। এ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত হয়েছে। পানি, ড্রেনেজ ও সুয়ারেজ সমস্যার সমাধান করবে ওয়াসা। ইতোমধ্যে রাজউক ৪টি স্কুল করে দিয়েছে। আরও বেশ কিছু শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আমরা করে দেব। এর জন্য ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় করার জন্য জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ১১টি মন্ত্রণালয়কে নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, থানা করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চিঠি পাঠানো হচ্ছে।’

এদিকে পূর্বাচল নতুন শহরকে ঢাকা ওয়াসার অধিভুক্ত এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় আনতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের ৬ মে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয়। এতে বলা হয়, পূর্বাচলে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশনের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসাকে দেওয়া হবে। পাশাপাশি আবর্জনা অপসারণ, রাস্তার পরিচ্ছন্নতা, বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স প্রদানসহ নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে এলাকাটি ডিএনসিসির আওতায় আনা প্রয়োজন।

পূর্বাচলকে কেন্দ্র করে নতুন সিটি করপোরেশন গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তবে তা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় আপাতত পূর্বাচলকে ডিএনসিসির অধীনে আনার সুপারিশ করা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মাহবুবা আইরিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গণপূর্ত ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব আমরা পেয়েছি। এ নিয়ে কাজ চলছে, তবে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা