ফারহান ফাইয়াজ
সাইফ বাবলু
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৫ ১৬:৪২ পিএম
রাজধানীর বেইলি রোডে ৩০ বছর ধরে নিজ ফ্ল্যাটে বসবাস আমেরিকান লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি (মেটলাইফ আলিকো) কর্মকর্তা আলহাজ শহিদুল ইসলাম ভূইয়া ও ফারহানা দিবা দম্পতির। ছেলে ফারহান ফাইয়াজ ও মেয়ে সায়ীম ইসলাম ফারিনকে নিয়ে সুখেই দিন কাটছিল এই দম্পতির। সংসারে তাদের কোনো কিছুরই কমতি ছিল না। কিন্তু এক বছর ধরে সংসারে শূন্যতা বিরাজ করছে। সবাই থাকলেও নেই শুধু ফারহান ফাইয়াজ, যে ছিল গোটা পরিবারের মধ্যমণি।
গত বছরের ১৮ জুলাই ধানমন্ডিতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজ। ছেলেকে হারানোর বছর পার হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি বাবা শহিদুল ইসলাম ও মা ফারহানা দিবা। নিজের চাকরি ছেড়ে এখন শহিদুল ইসলাম সামাজিক কর্মকাণ্ডে ছেলের ছোঁয়া খুজে পাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে মা ফারহানা দিবা নিজেকে গুটিয়ে একা হয়ে গেছেন। একমাত্র বোন সায়ীম ইসলাম ফারিনও ভাইয়ের শূন্যতায় নিজেকে ঠিক রাখতে পারছেন না ।
কথা হয় ফারহানের বাবা শহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, একমাত্র ছেলে ছাড়া এক বছর পার করেছি। একমাত্র ছেলেকে ছাড়া ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা পার করতে হয়েছে। প্রতি ঈদে গোটা পরিবারকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাব পৌর এলাকায় যেতাম। এবার ছেলে না থাকায় গ্রামেও যাওয়া হয়নি। ছেলের রুহের মাগফিরাত কামনায় এক বছর নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড করেছি।
তিনি বলেন, ফারহান ও ফারিন পিঠাপিঠা ভাইবোন। ফারহান ছিল বড়। এর চেয়ে ১ বছর ১০ মাস ছোট সায়মা ফারিন। ক্লাস থ্রিতে ফারহান ভর্তি হয় রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। ওই স্কুল থেকেই বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ অর্জন করে এইচএসসিতে ভর্তি হয়েছিল ফারহান। পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষা শেষ করে গবেষক হওয়ার স্বপ্ন দেখত সে। আমাদের বলত পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে চায়। ও ওর কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি কমিটির সহসভাপতি ছিল। গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা থেকেও এর বিষয়ে ওর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চিঠি এসেছিল। নাসার গবেষণাধর্মী বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিল। কিন্তু এক বুলেটে সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় ফারহানের। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমাদেরও আশা-আকাঙ্ক্ষারও মৃত্যু ঘটেছে।
শহিদুল ইসলাম বলেন, ফারহানের মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছে ওর মা। ছেলেকে হারিয়ে সে একেবারে চুপচাপ হয়ে গেছে। আগে যেমন সবার সঙ্গে কথা বলত, আত্মীয়স্বজনের বাসায় যাতায়াত ছিল। ছেলের কখন কী লাগবে, পড়াশোনা, ছেলের বিষয়গুলো খেয়াল রাখা, সবকিছু ওর মা সামাল দিত। সেই ছোট্ট থেকে ছেলে ও মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া ও বাসায় ফেরার যে ক্লান্তিময় জীবন সেই জীবন হঠাৎ থমকে গেছে ফারহানের মায়ের। আগের মতো আর হাসিখুশি থাকে না।
গত বছরের ১৮ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান। ওইদিন সহপাঠীদের সঙ্গে ধানমন্ডি এলাকায় আন্দোলনে যোগ দেয় ফারহান ফাইজ। ঘটনার সঙ্গে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের এক পর্যায়ে গুলি লাগে ফারহানের বুকে। সঙ্গে সঙ্গে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়েন। এরপর ছেলের মৃত্যুর খবর পান ফারহানের বাবা-মা। ফারহানকে দাফন করা হয় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌর এলাকায়। সেখানে দাদাবাড়িতে চিরনিদ্রনায় ফারহান ফাইয়াজ। ফারহাজ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত ১০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন বাবা শহিদুল ইসলাম ভূইয়া। সেই মামলায় সাবেক ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে।
শহিদুল ইসলাম বলেন, ফারহানের স্মৃতি ধরে রাখতে তিনি ফারহান ফাইয়াজ নামে একটি ফাউন্ডেশনে করেছেন। ওই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এখন বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বেশিরভাগ সময় কাটে। মেটলাইফ আলিকোর চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। এখন ফারহান ফাইয়াজের নামে ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে গেল বন্যায় কুমিল্লার বুড়িচং এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন। এবার শীতেও দরিদ্রদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন। এবার দেড়শ শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের ঈদসামগ্রী বিতরণ করেছেন।
ফারহানের স্মরণে আজকের অনুষ্ঠান
আজ ১৮ জুলাই ফারহান ফাইয়াজের নামে বরপা এলাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক স্কুলের নামকরণ করা হচ্ছে। শহীদ ফারহান ফায়াজ বরপা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামকরণের ফলক উন্মোচনের জন্য তারাব পৌরসভা অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ফারহানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পারিবারিকভাবে কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিলসহ নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে শহীদ ফারহান ফায়াজ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে।