ফিরে দেখা ১৮ জুলাই
তানভীর হাসান
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৫ ১৬:৩২ পিএম
গত বছরের ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাইদের মৃত্যুর পর আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সংবাদপত্রের হিসাবে ১৬-১৮ জুলাই পর্যন্ত শুধু রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হাতে কমপক্ষে ২৫ জন নিহত হন। সব মৃত্যুই বেদনাদার হলেও এর মধ্যে একটি মৃত্যু সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। পানি লাগবে কারও? পানি, পানি- এমন বক্তব্য দিয়ে ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরার আজমপুর এলাকায় ক্লান্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পানি বিতরণ করছিলেন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। এর কিছুক্ষণ পর আজমপুরের সড়কে তার গুলিবিদ্ধ দেহ পড়ে ছিল। পাশেই ছিল পানির কেস। এই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সর্বস্তরের জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলনে যোগ হয় নতুন মাত্রা। এদিকে আন্দোলন আর মানবতার প্রতীক হয়ে ওঠা মুগ্ধর সাহসিকতা ও বীরত্বের গল্প কেবল দেশেই নয়, ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়েও। মুগ্ধ হত্যার ঘটনায় পরিবার মামলা না করলেও পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করে। সেটি আমলে নিয়ে তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মুগ্ধের পরিবারের অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। শুধু মুগ্ধ নয়, উত্তরা-কেন্দ্রিক সব গণহত্যার তদন্ত চলমান। ফলে এই বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
মুগ্ধর বাবার নাম মীর মোস্তাফিজুর রহমান, মায়ের নাম শাহানা চৌধুরী। তাদের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিন ভাইয়ের মধ্যে মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ ও মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ছিলেন যমজ। মুগ্ধ ২০২৩ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক শেষ করেন। এরপর ঢাকায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) প্রফেশনাল এমবিএ করছিলেন। মৃত্যুর পরও তার গলায় ঝুলে ছিল বিইউপির রক্তমাখা আইডি কার্ডটি। মুগ্ধর মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তের ছোট্ট একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। যেটি পোস্ট করেন মুগ্ধর যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, হাতে অনেকগুলো পানির বোতল নিয়ে হাঁটছেন মুগ্ধ। আর আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ করে বলছেন, ‘এই পানি লাগবে? পানি… পানি লাগবে? পানি।’ সেই ডাকে সাড়া দিয়ে অনেকে তার কাছ থেকে পানি ও বিস্কুট চেয়ে নিচ্ছেন। আন্দোলনে মুগ্ধর এই মুগ্ধতা ছড়ানো ভূমিকার ভিডিও এখনও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে রয়েছে। মুগ্ধর হাস্যোজ্জ্বল অনেক ছবিও আছে ফেসবুকে। শুধু নেই মুগ্ধ! তার নাম জ্বলজ্বল করছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের শহীদের তালিকায়।
বন্ধুরা বলছেন, সরকারি চাকরির প্রতি তেমন কোনো আকর্ষণ ছিল না মুগ্ধর। কখনও সরকারির জন্য আবেদন করার ইচ্ছাও দেখা যায়নি তার মধ্যে। অথচ এই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে গিয়ে তাদের প্রিয় বন্ধুর মৃত্যু হয়েছেÑ এটাই তাদের জন্য বড় কষ্টের।
মুগ্ধর বন্ধু রবিউল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আর মুগ্ধ একই রুমে থাকতাম। স্নাতক শেষ করার পর সে ঢাকায় চলে যায়। আমাদের দুজনের অনেক মজার মজার স্মৃতি রয়েছে। মুগ্ধর বন্ধু হিসেবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগার জায়গা হচ্ছেÑ সে হয়তো কোনোদিন সরকারি চাকরিতে আবেদনের জন্য ফরম তুলত না। অথচ সেই চাকরির জন্য তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। মুগ্ধ ফ্রিল্যান্সিং করত। সেখান থেকে সে ভালো টাকাও আয় করত। ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে তার সব রকমের আগ্রহ ছিল।
জানা গেছে, ১৮ জুলাই মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার বন্ধু জাকিরুল ইসলাম তাকে রাজধানীর ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে তার মরদেহ কামারপাড়া বামনারটেক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় মুগ্ধর পরিবার মামলা না করলেও পুলিশ বিভিন্ন ফুটেজ দেখে রফিকুল ইসলাম অশ্রু নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে।
এদিকে ঘটনার এক বছর পার হতে চললেও মুগ্ধকে হারিয়ে পুরো পরিবার এখনও শোকে কাতর। মা-বাবা সারাক্ষণ ছেলের জন্য দোয়া কামনা ও তার স্মৃতি নিয়ে পড়ে আছেন। প্রিয় ভাইকে হারিয়ে অন্য ভাইরাও শোকাহত।
মুগ্ধ হত্যার ৬ মাস পর গত ১৭ জানুয়ারি তার পরিবারের সদস্যরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। পরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মুগ্ধর বড় ভাই মীর মাহমুদুর রহমান (দীপ্ত) ও ভাই মীর মাহবুবুর রহমান (স্নিগ্ধ)।
এ সময় মীর মাহমুদুর রহমান বলেন, পুলিশের গুলিতেই মুগ্ধর মৃত্যু হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তারা এটা নিশ্চিত হয়েছেন। এখন কোন পুলিশ সদস্যের গুলিতে মুগ্ধর মৃত্যু হয়েছে, এই হত্যার ঘটনায় কে বা কারা নির্দেশ দিয়েছেনÑ এগুলো খুঁজে বের করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দায়িত্ব সরকারের।
মুগ্ধর মৃত্যুর এক বছর পরও মা-বাবা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বলে জানান মীর মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, চেষ্টা ছিল তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার; কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি।
এদিকে ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের দায়িত্বে ছিলেন। তবে গত ১৩ জুলাই দায়িত্ব ছাড়েন তিনি। এরপর থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যে কজন অগ্রবর্তী সৈনিক তাদের জীবন দিয়েছিলেন, মুগ্ধ তাদের অন্যতম। তাদের আত্মত্যাগের কারণে আন্দোলন বেগবান হয়ে শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল। যার পরিণতিতে ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। দেশ হয়েছে স্বৈরাচারমুক্ত। ইতিহাসে মুগ্ধর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে মানবিকতার প্রতীক হয়ে ওঠা মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধকে। তার স্মরণে ইতোমধ্যে ঢাকার উত্তরায় বঙ্গবন্ধু মুক্তমঞ্চের নাম পরিবর্তন করে ‘মুগ্ধমঞ্চ’ রাখা হয়েছে।