× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অপচয় রোধে আরেক অপচয়ের আয়োজন

আরমান হেকিম

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৫ ০৯:০২ এএম

অপচয় রোধে আরেক অপচয়ের আয়োজন

গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় অপচয় ও অব্যবস্থাপনা ঠেকাতে নেওয়া তিতাসের ৮ হাজার ১৬১ কোটি টাকার প্রকল্প যেন অপচয়ের দৃষ্টান্ত হতে যাচ্ছে। কোনো স্থাপনা তৈরি না করলেও প্রকল্পটিতে ১৩ একরের বেশি জমি কেনা হচ্ছে ১৮১ কোটি টাকায়। অভিজ্ঞতা থাকার পরেও পরামর্শক খাতে ৩০৮ কোটি টাকা ব‍্যয় ধরা হয়েছে। রাস্তা কাটাকাটি করে পুরনো পাইপ তুলে নতুন পাইপ লাগাতে ৩ হাজার ২১৮ কোটি টাকা ব‍্যয় ধরা হয়েছে, যা অতিরিক্ত বলে আপত্তি উঠেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জ্বালানি খাতের ৭৫ শতাংশ এলএনজি গ‍্যাস হবে, সেখানে এত ব‍্যয়ের এই পাইপলাইন তৈরি করে লাভ কী। সেগুলো তো তখন এমনিতেই পরিত্যক্ত হয়ে যাবে। 

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পটিতে নানা খাতে অতিরিক্ত ব‍্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। আবার এমন খাত যুক্ত করা হয়েছে যেগুলোর কোনো প্রয়োজনই নেই। আবার অনেক ব‍্যয়ের পূর্ণাঙ্গ তথ‍্যও নেই। 

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘রিপ্লেসমেন্ট অ্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট অব দ্য এক্সিসটিং গ্যাস নেটওয়ার্ক ইন ঢাকা অ্যান্ড নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এরিয়া, ইনকরপোরেটিং জিআইএস ম্যাপিং অ্যান্ড স্ক্যাডা সিস্টেম’ শীর্ষক প্রকল্পের মূল‍্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. রুহুল আমিন। সেখানে ব‍্যয়ের এসব অসঙ্গতির বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে তথ‍্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই প্রকল্পের ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ধরা হয়েছে রোড রেস্টোরেশনে, যেখানে খরচ দেখানো হয়েছে ৩ হাজার ২১৮ কোটি টাকা। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পুরনো পাইপলাইন তুলে নতুন বসানোর সময় রাস্তা কাটাকাটি ও সংস্কার কাজে এ খরচ হবে। কিন্তু প্রকৌশলীদের অনেকেই বলছেন, এই ব্যয় অস্বাভাবিক এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে রোড রেস্টোরেশনের খরচ অনেক কমানো সম্ভব। অথচ প্রকল্পে এ নিয়ে কোনো ব্যয় হ্রাসের পরিকল্পনা নেই।

এ ছাড়া পরামর্শক খাতে ৩০৮ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে। এর আগেও তিতাস গ্যাস এমন ধরনের প্রকল্প করেছে, তাই পরামর্শকের দরকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কোনো স্থাপনা তৈরি করলে সেখানে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় কোনো স্থাপনা তৈরি করা হবে না। তারপরও প্রায় ১৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ দশমিক ২৪ একর ভূমি কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর বাইরেও ৬৭৭ কোটি টাকা রাখা হয়েছে এসসি‌এডিএ ও জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবস্থার উন্নয়নে, যদিও আগের প্রকল্পে এসব খাতে ব্যয় হলেও তা থেকে কী ফল মিলেছে, তার নিরীক্ষা নেই।

এই পরিস্থিতিকে কটাক্ষ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ‘গ্যাসেরই আর কোনো নিরাপদ ভবিষ্যৎ নেই, তার জন্য নতুন করে কোটি কোটি টাকা খরচ করে অবকাঠামো তৈরি করা মানে হচ্ছে জনগণের অর্থ অপচয় করা।’

তিনি বলেন, ‘তিতাস পেট্রোবাংলা থেকে গ্যাস কিনে দেয়। এখন ৭৫ শতাংশ দেশি গ্যাস আছে, পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী ২০৩০ সালে ৭৫ শতাংশই এলএনজি হবে। তখন এই নতুন পাইপলাইনে কি তিতাস এলএনজি দেবে, নাকি পানি?’

তিতাস গ্যাসের বিতরণ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই অস্বচ্ছতার অভিযোগে আলোচিত। বহু গ্রাহকই অভিযোগ করেন, তারা নিয়মিত বিল পরিশোধ করলেও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সুবিধা পান না। আবার মিটার ভাড়ার নামে বছরের পর বছর অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে সংস্থাটি। সেই বাস্তবতায় এমন একটি প্রকল্প, যেখানে উন্নয়ন ব্যয়ের অনুপাতে কার্যকারিতা অনিশ্চিত, তা স্বাভাবিকভাবে বিতর্ক তৈরি করেছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে প্রকল্পের সময়সীমা ও এর ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত-পাঁচ বছর ছয় মাস। অথচ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন কোনো প্রকল্প চার বছরের বেশি সময়ের জন্য নেওয়া যাবে না। শুধু তা-ই নয়, জ্বালানি বিভাগের নীতিমালায় বলা হয়েছে, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশীয় গ্যাস সরবরাহ কমে যাবে ২৫ শতাংশে। ফলে প্রকল্পের লক্ষ্য ও মেয়াদ পরস্পরবিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বৈদেশিক সহায়তার দিক থেকেও প্রকল্পটি বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে যাচ্ছে। ৮ হাজার ১৬০ কোটি টাকার প্রকল্পটির ৩ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি)। সরকার দেবে আরও ৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা অনুদান। শুধু তিতাস দেবে ৮২১ কোটি টাকা। অথচ অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, তিতাস পরিচালিত বেশ কয়েকটি প্রকল্প সময়মতো শেষ হয়নি, ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। এসব কারণে পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে এবং প্রকল্পটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রকল্পটির ঋণের সুদের হার কত হবে জানতে চাইলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এ ঋণের সুদহার হবে বাজারভিত্তিক। তবে কোন মুদ্রায় ঋণ অনুমোদন হবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। যদি চীনা মুদ্রায় ঋণ নেওয়া হয় তবে ঋণের সুদহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ হবে, যদি ডলারে নেওয়া হয় তবে ৬ শতাংশের কাছাকাছি হবে। তবে প্রকল্প চূড়ান্ত হলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

প্রকল্পে বলা হয়েছে, পাইপলাইনের ভেতরে ক্যাথোডিক প্রটেকশন ব্যবস্থা নষ্ট হওয়ায় লিকেজ বাড়ছে। সেটি সংস্কার করে গ্যাস অপচয় কমানো হবে। কিন্তু প্রকৌশলীরা বলছেন, এই প্রযুক্তি ব্যবস্থার জন্য যেসব যন্ত্রপাতি ও নেটওয়ার্ক বসানো হবে, তা কোথা থেকে কেনা হবে, কারা বসাবে, কারা পরিচালনা করবেÑ এসব প্রশ্ন এখনও পরিষ্কার নয়।

তিতাস দাবি করেছে, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা ২৭৫ এমএমসিএফডি থেকে বাড়িয়ে ১০০৮ এমএমসিএফডি করা যাবে এবং বর্তমানে মাসে ৩৩৩টি গ্যাস লিকেজের ঘটনা কমে ৬৬টিতে নামিয়ে আনা যাবে। এতে করে বছরে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ ২০ দশমিক ৬ লাখ টন থেকে কমে ৫ লাখ টনে নেমে আসবে বলেও দাবি করা হয়েছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা