× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আবু সাঈদের আত্মদানে ইতিহাসের বাঁকবদল

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৫ ০৮:৫৮ এএম

আবু সাঈদের আত্মদানে ইতিহাসের বাঁকবদল

২০২৪ সালের জুলাই নতুন ইতিহাস রচনার এক জ্বলন্ত অধ্যায়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৬ জুলাই উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। সড়ক, রেললাইন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবখানেই অবরোধ গড়ে তোলে শিক্ষার্থীরা। রাজধানী থেকে জেলা শহর পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে কোটা সংস্কারের দাবিতে।

তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও পুলিশের পাল্টা প্রতিরোধে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। দেশের ইতিহাসের গতিপথ বদলে যায় এই দিনেই। তিনটি বিভাগে প্রাণ হারায় অন্তত ছয়জন। আহত হয় চার শতাধিক। কেউ গুলিবিদ্ধ, কেউ লাঠিপেটায় নিথর হয়ে পড়ে। দফায় দফায় ছোড়া হয় গুলি, রাবার বুলেট, টিয়ারশেল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দমন-পীড়নের মাত্রাও বাড়তে থাকে।

এমন উত্তাল মুহূর্তে রংপুরে এক যুবক বুক পেতে দাঁড়িয়ে যায় বুলেটের সামনেÑ প্রসারিত দুই হাতে ঢাল হয়ে ওঠেন সহপাঠীদের জন্য। গুলি লাগে, তবু পিছু হটে না। বারবার উঠে দাঁড়ায়, শেষ পর্যন্ত জীবন দিয়েই রচনা করে নতুন ইতিহাস। তার নাম আবু সাঈদ। যার মৃত্যু ক্ষমতার মসনদ নাড়িয়ে দেয়। শুরু হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের ক্ষণ গণনা।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জুলাই বিকালের দিকে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীরা জড়ো হলে পুলিশ তাদের ওপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ শুরু করে। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক হিসেবে নেতৃত্বে ছিল ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। পুলিশের ধাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে আবু সাঈদ দুই হাত মেলে বুক পেতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার বিপরীত পাশের মাত্র ১৫ মিটার দূর থেকে অন্তত দুই পুলিশ সদস্য শটগান থেকে সরাসরি তার ওপর গুলি চালায়। তবুও সটান দাঁড়িয়ে থাকে নির্ভীক আবু সাঈদ। একাধিক গুলি বিদ্ধ করে তাকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগ পর্যন্তও সে পিছু হটেনি। 

সহপাঠীরা দৌড়ে গিয়ে তাকে হাসপাতালে নিতে চাইলেও পথেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে আবু সাঈদ। তার রক্তমাখা জামা, নিথর শরীর আর গুলিবিদ্ধ হওয়ার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। মুহূর্তেই তা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। রংপুর থেকে শুরু হয়ে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে। একদিকে সরকারের কঠোর দমননীতি, অন্যদিকে এক তরুণের বিরল আত্মত্যাগ এই দুই মিলেই তৈরি হয় তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা।

আবু সাঈদের মৃত্যু দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে যায় প্রবাসেও। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি ও বিদেশি শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে। নিউইয়র্ক, লন্ডন, টরন্টো, সিডনি ও দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত হয় বিক্ষোভ। ‘জাস্টিস ফর আবু সাঈদ’ ব্যানার হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যান প্রবাসীরা। কয়েকটি দেশ থেকে প্রবাসী শ্রমিকরা রেমিট্যান্স বন্ধেরও হুঁশিয়ারি দেয়। কেউ কেউ জানায়Ñ বৈধ পথে টাকা পাঠাবে না।

আবু সাঈদের মৃত্যুই যেন দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। আন্দোলন শুরুর ৩৬তম দিনেই সরকার পতনের ঘোষণা আসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান।

৫ আগস্টের পর আবু সাঈদ প্রসঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেত্রী বলেছিলেন, ‘আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত ছবি আমাদের ইতিহাসে থাকবেÑ যেমন ১৯৫২-তে সালাম-রফিক, যেমন ৭১-এ গেরিলা, তেমন ২৪-এ আবু সাঈদ। ১৬ জুলাইয়ের এই শহীদ এখন কেবল একটি নাম নয়Ñ সে এক চেতনার নাম, যা বদলে দিয়েছে সময়ের গতি, ইতিহাসের পাঠ। আবু সাঈদের সাহসী বুকই ফ্যাসিবাদের কবর খুঁড়েছিল।’

আবু সাঈদের মৃত্যুর কয়েক মাস পর প্রকাশিত হয় তার স্নাতক চূড়ান্ত পরীক্ষার ফলাফল। তিনি সিজিপিএ ৩.৩০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। বিভাগের ৬৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৪তম স্থান অর্জন করে সে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, ‘আবু সাঈদ আজ আমাদের মাঝে নেই, তবে তার মেধা ও সংগ্রামের স্মৃতি চিরকাল আমাদের সঙ্গে থাকবে। এটি আমাদের জন্য আনন্দের, একইসঙ্গে গভীর বেদনারও।’

এ ছাড়া শহীদ আবু সাঈদ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষাও উত্তীর্ণ হয়েছিলÑ যা আরও একবার প্রমাণ করে, সে ছিল একাধারে মেধাবী ও সচেতন নাগরিক। তার মৃত্যু শুধু একটি আন্দোলনের প্রতীক নয়Ñ তা ইতিহাসের বাঁকবদলেরও সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৬ জুলাইকে প্রথমে ‘শহীদ আবু সাঈদ দিবস’ ঘোষণা করে। যদিও সমালোচনার মুখে পরে নাম পরিবর্তন করে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ রাখা হয়। এ দিনটিকে ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, ফলে ছুটি থাকছে না। তবে দেশের সব স্কুল-কলেজে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালনের জন্য নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

অবশ্য এর আগেই শহীদ আবু সাঈদের প্রতি সম্মান জানাতে দেশব্যাপী নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। তার নামে বাংলা নতুন ফন্ট উন্মুক্ত করে কোডপত্র। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কর্মীরা রংপুর পার্ক মোড়ের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‌‘আবু সাঈদ চত্বর’। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গেটের নামকরণ করেন ‘শহীদ আবু সাঈদ গেট’। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভেনশন সেন্টারের নাম ‘শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার’ রাখা হয়। এ ছাড়া রংপুর জেলা সুইমিংপুলের নাম পাল্টে করা হয় শহীদ আবু সাইদ সুইমিংপুল।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা