ফিরে দেখা জুলাই অভ্যুত্থান
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৫ ১৬:১৩ পিএম
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের এক দফা দাবিতে গত বছরের ১৪ জুলাই হয়ে ওঠে স্মরণীয় এক দিন। ওইদিন রাজধানীতে পুলিশের একাধিক ব্যারিকেড ভেঙে শিক্ষার্থীরা বঙ্গভবন পর্যন্ত পৌঁছে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেন। মধ্যরাতে ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’- এই স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো।
এদিন পূর্বঘোষিত পদযাত্রা কর্মসূচিতে অংশ নিতে বেলা ১১টা থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন। দুপুর ১২টার দিকে সেখান থেকে পদযাত্রা শুরু করেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘুরে পদযাত্রাটি শাহবাগ, মৎস্য ভবন এলাকা হয়ে হাইকোর্টের সামনে এলে পুলিশ শিক্ষার্থীদের বাধা দেয়। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে তারা এগিয়ে যান গুলিস্তান পর্যন্ত। পথে পথে ব্যারিকেড, জলকামান, সাঁজোয়া যান থাকলেও, হাজারো শিক্ষার্থী রাস্তা ব্লক করে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন- ‘মেধা না কোটা, মেধা মেধা।’ গুলিস্তান পাতাল মার্কেটের সামনে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করে ব্যারিকেড ভেঙে তারা এগিয়ে যান বঙ্গভবনের দিকে।
দুপুর ২টার দিকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বঙ্গভবনে প্রবেশ করে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন। পরে বেলা ৩টার দিকে তারা বেরিয়ে আসেন।
স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালের গণআন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে নবম থেকে ত্রয়োদশ গ্রেড পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করা হলেও তা ছিল আশাভঙ্গের সিদ্ধান্ত। কারণ শিক্ষার্থীরা দাবি জানিয়েছিলেন, সব গ্রেডে বৈষম্যমূলক কোটা সংস্কারের। তারা উল্লেখ করেন, সংবিধান অনুযায়ী অনগ্রসর ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ কোটা রেখে বাকিগুলোতে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং এ বিষয়ে সংসদে আইন পাস করতে হবে।
প্রতিনিধিদল বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে আসার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘স্মারকলিপিতে আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে ২৪ ঘণ্টার একটি সুপারিশ করেছি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংসদে অধিবেশন ডেকে আমাদের এক দফা দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমরা এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চাই।’
আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে নাহিদ বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের বিরুদ্ধে অজ্ঞাতনামা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। এটি আমরা আরও ২৪ ঘণ্টা বাড়িয়ে দিচ্ছি। এর মধ্যে মামলা প্রত্যাহার করা না হলে, আমাদের কর্মসূচি আরও কঠোর হবে।’
বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ মিছিল নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে চলে যায়, আরেক অংশ ফিরে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।
শুধু ঢাকায় নয়, সেদিন দেশের প্রায় সব জেলা শহরে শিক্ষার্থীরা পদযাত্রা করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, আনন্দ মোহন কলেজসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর সরকারি কলেজ, কারমাইকেল কলেজসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে স্মারকলিপি দেন। এছাড়া পাবনা, কুষ্টিয়া, বরিশাল, টাঙ্গাইল, নাটোর, ঝিনাইদহ, নেত্রকোণার দুর্গাপুর, কুড়িগ্রামের চিলমারী- এমনকি গ্রামীণ অঞ্চলেও শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও মিছিল করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে সমাবেশ করেন।
এদিন বিকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘কোটা বিষয়ে আমার কিছু করার নেই, সমাধান হবে আদালতে।’ এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতি না পেলে, রাজাকারের নাতিপুতি চাকরি পাবে?’এই বক্তব্যে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে তারা মিছিল নিয়ে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন। ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’-এই স্লোগানে মুখর হয় মধ্যরাত।
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কয়েকটি হলে শিক্ষার্থীদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাধা টপকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসেন। বুয়েটের কয়েকশ শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে টিএসসিতে যোগ দিয়ে আবার নিজের ক্যাম্পাসে ফিরে যান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত ১১টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা চালায়। এদিন রাতে ছাত্রলীগের তিন নেতা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সংগঠন থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।