ফিরে দেখা জুলাই অভ্যুত্থান
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৫ ১৫:৪৫ পিএম
আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৫ ১৫:৪৬ পিএম
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা আন্দোলনের চিত্র। ছবি সংগৃহীত
গত বছরের ১১ জুলাই সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেন। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, সেদিন বেলা ৩টা থেকে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক, রেল ও মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন তারা। তবে পুলিশের বাধা, লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল নিক্ষেপে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি।
ঢাকায় শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিতে চাইলে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে জলকামান ও সাঁজোয়া যানসহ প্রস্তুতি নেয় পুলিশ। বিকাল ৫টার দিকে শিক্ষার্থীরা ব্যারিকেড অতিক্রম করে শাহবাগ মেট্রো স্টেশনের নিচে অবস্থান নেন। এ সময় তারা স্লোগান দেনÑ ‘ভয় দেখিয়ে আন্দোলন, বন্ধ করা যাবে না’, ‘হামলা করে আন্দোলন, বন্ধ করা যাবে না’, ‘কোটা না, মেধা; মেধা, মেধা’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’। স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো শাহবাগ এলাকা। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করেই তারা কর্মসূচি চালিয়ে যান।
সেদিন পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়Ñ এমন কর্মসূচি থেকে শিক্ষার্থীদের বিরত থাকতে হবে। ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির নামে রাস্তায় নামলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে সারা দেশে অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় গেটের সামনে পুলিশের লাঠিচার্জে ১০ জন আহত হন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন ফটকে তালা দিয়ে শিক্ষার্থীদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে, তালা ভেঙে শাহবাগে পৌঁছেন তারা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিকাল থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন।
চট্টগ্রামে লাঠিচার্জে ৭ জন এবং কুমিল্লায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনের সামনে সংঘর্ষে ৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হন, যাদের মধ্যে ৯ জনের অবস্থা ছিল গুরুতর। সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পুলিশের বাধার মুখে পড়েন এবং পাঁচজন আহত হন। দেশের প্রায় সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেনÑ রাজশাহী, বরিশাল, কুষ্টিয়া, যশোর, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালন করা হয়।
তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন পর্যায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। আন্দোলনের বিষয়ে বলা হয়, কোটা নিয়ে আপিল বিভাগের আদেশের পর শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের চিঠি দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানোর নির্দেশ দেয়।
এদিনই হাইকোর্ট ২০১৮ সালের কোটা বাতিল সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনকে অবৈধ ঘোষণা করে রায়ের মূল অংশ প্রকাশ করে। রায়ে বলা হয়Ñ সরকার চাইলে কোটাপদ্ধতি সংশোধন করতে পারবে।
শিক্ষার্থীরা তাদের বক্তব্যে জানানÑ এই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা নয়, এটি একটি ন্যায্য দাবির আন্দোলন; যেখানে তাদের জবাব দিতে হচ্ছে লাঠি ও টিয়ার গ্যাসের মুখোমুখি হয়ে। আন্দোলনকারীরা ১২ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেন।
কোটাবিরোধী আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা বাংলা ব্লকেড নামে মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, ‘কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অনেকে তাদের (আন্দোলনকারীদের) ব্যবহার করার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছে। তাদের ষড়যন্ত্রে পা না দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিন। তারা মেধাবী ছেলে, কেন তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাবে? জানমালের ক্ষতি করলে, অগ্নিসংযোগ করলে, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করলে তো পুলিশ বসে থাকবে না।’