আদালতে হাবিবুল আউয়াল
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৫ ২১:২৯ পিএম
২০২৪ সালের নির্বাচন ‘ডামি ও প্রহসনের’ ছিল স্বীকার করে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, নির্বাচনটি এত ‘ভয়ংকর’ হবে জানলে তিনি দায়িত্বই নিতেন না।
বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোস্তাফিজুর রহমানের আদালতে রিমান্ড শুনানিকালে তিনি এ কথা বলেন।
আদালতের কাঠগড়ায় বিচারকের উদ্দেশে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আছে। এটা রাষ্ট্রীয় নির্বাচন কাঠামোর সমস্যা। কিন্তু সংবিধান ও আইনের পরিপন্থি কোনো কাজ আমি করিনি। দেশের নির্বাচনি কাঠামো সংশোধন না করলে এক হাজার বছরেও নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। সেটা করার জন্য সংস্কার লাগবে।’
এদিন দুপুরের দিকে রাষ্ট্রদ্রোহ ও অন্যায় প্রভাব খাটিয়ে প্রহসনের নির্বাচন করার অভিযোগে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাবেক এই সিইসিকে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে তাকে শুনানির জন্য আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হয়।
আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শেরেবাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক শামসুজ্জোহা সরকার আসামির ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ডের পক্ষে শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘এই আসামি ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার আমলে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি এদেশে কলঙ্কজনক নির্বাচন হয়। সেই ডামি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও ২/১টি দল ছাড়া আর কেউ অংশ নেয়নি। সেই নির্বাচন ছিল ডামি নির্বাচন, একতরফা, লোক দেখানো ও প্রহসনের নির্বাচন। তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দিতে পারেননি।’
ওমর ফারুক বলেন, ‘৭ জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘সারা দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হচ্ছে’। ওইদিন সকাল ৮টা থেকে ৩টা পর্যন্ত ২৭.১৫ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানান। তার এক ঘণ্টা পর ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানান। অথচ আমরা দেখেছি কেন্দ্রগুলোতে কোনো মানুষ ছিল না।’
শুনানিতে সরকারি এই কৌঁসুলি আরও বলেন, ‘আসামির বিরুদ্ধে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে আঁতাত করার অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনে বরাদ্দ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। সংবিধান বহির্ভূত বক্তব্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহ করেছেন। আমরা তার সর্বোচ্চ রিমান্ড প্রার্থনা করছি।’
এদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী এমিল হাসান রুমেল তার রিমান্ড বাতিল চেয়ে বলেন, ‘তার বয়স ৭০। তিনি অনেক দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছেন। আমরা যেন ফ্যাসিস্ট দমাতে গিয়ে নিজেরা ফ্যাসিস্ট না হয়ে যাই।’
এ সময় আদালতের অনুমতি নিয়ে কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমি স্বীকার করছি, আমি ডামি নির্বাচন করেছি। রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে একতরফা নির্বাচন হয়েছে। তবে এখানে আমাকে পয়সা দেওয়ার কোনো প্রশ্ন আসেনি। আমার জীবনে আমি অর্থ আত্মসাৎ বা দুর্নীতি করিনি।’
এ সময় তাকে থামিয়ে দিয়ে বিচারক বলেন, ‘প্রত্যেক জেলায় নির্বাচনী তদন্ত কমিটি করা হয়। যেখানে একজন যুগ্ম জেলা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকেন। আগে যার ভাতা ছিল ২২ হাজার টাকা, সেটা আপনি ৫ লাখে উন্নীত করেছেন। এতে কি জনগণের টাকা অপচয় হয়নি? এ বিষয়ে তার জানা নেই বলে কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘পাঁচ বছরের মুদ্রাস্ফীতি হিসাব করে হয়তো ভাতা বাড়ানো হয়েছিল।’
নির্বাচনী তদন্ত কমিটি কোথাও কি তারা সরেজমিন গিয়েছিলেন- বিচারকের এমন প্রশ্নের উত্তরে আউয়াল বলেন, ‘একজন রিটার্নিং অফিসারের অধীনে ৪-৫টা সংসদীয় আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাকে সহযোগিতা করতে আরও ৪-৫ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসার থাকেন। একটা নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করার জন্য দুই ভাগ দায়িত্ব কমিশনের, বাকি ৯৮ ভাগ দায়িত্ব মাঠ পর্যায়ে কাজ করা অফিসারদের।’
বিগত সময়ের নির্বাচনের কথা তুলে ধরে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়নের তিন মাসের মাথায় অনুষ্ঠিত ৭৩-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন পেয়েছিল। সেই নির্বাচনও সুষ্ঠু ছিল না। ক্ষমতার লোভ এমন যে শেখ মুজিবও তা সামলাতে পারেননি। শেখ মুজিবের মতো নেতা নির্বাচনে কারচুপি করেছেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করে। পরবর্তীকালে তারাই আবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে সংবিধান সংশোধন করে।’
নির্বাচনের আগে এমন অবস্থা জেনে আপনি পদত্যাগ করলেন না কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওই অবস্থায় পদত্যাগ করা সম্ভব ছিল না। আমার এক বন্ধুও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল পদত্যাগের কথা। আমি বলেছি, তুমি যদি আগে বলতা এমন ভয়ংকর নির্বাচন হবে, তাহলে আমি দায়িত্বই নিতাম না।’
এর আগে গত সোমবার এ মামলায় নুরুল হুদার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরে বুধবার রাজধানীর মগবাজার থেকে হাবিবুল আউয়ালকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
গত রবিবার বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন না করে উল্টো ভয়ভীতি দেখিয়ে জনগণের ভোট ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন করার অভিযোগে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করে বিএনপি। সংগঠনের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন খান বাদী হয়ে এ মামলা করেন। পরে গত ২৫ জুন এ মামলায় নতুন করে রাষ্ট্রদ্রোহ, প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ধারা যুক্ত করা হয়। এ মামলায় শেখ হাসিনা এবং সাবেক ১৫ নির্বাচন কমিশনারসহ মোট ২৪ জনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়।