হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৫ ১০:৪৭ এএম
বছর ঘুরে এসেছে আষাঢ়, ফুটেছে কদম ফুলও
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে মেঘের ঘনঘটা আর বৃষ্টির বারতা নিয়ে আগমন ঘটছে বর্ষা ঋতুর। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়Ñ ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে/ আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে।/ এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি/ পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি/ নূতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে/ আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে।’ বাংলা ক্যালেন্ডারে আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস নিয়ে বর্ষাকাল। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে দ্বিতীয় ঋতু ‘বর্ষা’। আজ আষাঢ়ের প্রথম দিন।
বর্ষা মানেই মেঘের চোখ রাঙানির সঙ্গে কখনও মুষলধারে, কখনও হালকা বা মাঝারি ধারার টানা বৃষ্টি। খাল-বিল-ঝিল, নদ-নদী-নালা থইথই পানিতে, স্রোতÑ বানের কাল। বাতাসে দোলনচাঁপা, কদম, মালতী আর কেতকীর সুবাস। বর্ষা মানেই মেঘের গর্জনের সঙ্গে বৃষ্টি আর প্রকৃতির তরু-পল্লবের শাখা-প্রশাখায়, লতায়-পাতায় স্নিগ্ধতাপূর্ণ অপরূপ গাঢ় সবুজ মিতালি। বর্ষার আগমনে বৃষ্টির রিমঝিম ছন্দে প্রেম-বিরহে মন ভরে ওঠে প্রাণচাঞ্চল্যে।
এমন প্রাণচঞ্চল ঋতু নিয়ে আদিকাল থেকেই বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় রয়েছে উচ্ছ্বসিত বন্দনা, অনুরাগ ও স্তুতি। বাংলা সাহিত্যে বর্ষা কখনও প্রেমের ঋতু, আবার কখনও বা বিরহের। মহাকবি কালীদাস মেঘদূত কাব্যে পাঠককে মুগ্ধ করেছেন আষাঢ়ের রূপে। মেঘদূত কাব্যে তিনি আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বিরহকাতর ‘যক্ষ মেঘ’কে দূত করে কৈলাশে পাঠিয়েছিলেন তার প্রিয়ার কাছে। যক্ষের সে বিরহ বারতা মেঘদূত যেন সঞ্চারিত করে চলেছে প্রতিটি বিরহকাতর চিত্তে, যুগ হতে যুগান্তরে।
বিদ্যাপতি তার কবিতায় বর্ষার আগমন, সৌন্দর্য এবং বিরহের প্রেক্ষাপটে বর্ষার প্রভাব ফুটিয়ে তুলেছেন। তার পদাবলিতে বর্ষা ও বিরহ একই সূত্রে গাঁথা, যেখানে বিরহী হৃদয়ের আকুতি মিশে যায় বর্ষার প্রকৃতির সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের বড় অংশজুড়ে আছে বর্ষা। আষাঢ় কবিতায় তিনি আহ্বান করেছেন, ‘ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন গানে রয়েছে মেঘ-মেদুর বর্ষার রূপ-ঐশ্বর্যের শিল্পিত বর্ণনা। বর্ষায় তিনি গেয়েছেন, ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে/ ময়ূরের মতো নাচে রে, হৃদয়/ নাচে রে।/ ঝরে ঘনধারা নবপল্লবে,/ কাঁপিছে কানন ঝিল্লির রবে,/ তীর ছাপি নদী কলকল্লোলে/ এল পল্লীর কাছে রে।’
আষাঢ় সাজে নানা রূপে। নবধারার জলে স্নান করে শীতল হওয়ার আহ্বান এখন প্রকৃতিতে। নতুন সুরের বার্তা নিয়ে সবুজের সমারোহে আসে এ বর্ষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়Ñ ‘ঐ আসে ঐ ঘন গৌরবে নবযৌবন বরষা, শ্যাম গম্ভীর সরসা...’। গ্রীষ্মের অগ্নিঝরা দিনগুলো যখন প্রকৃতিকে করে বিবর্ণ ও শুষ্ক এবং জনজীবনকে করে অসহনীয়, তখনই রিমঝিম বৃষ্টি ঝরিয়ে প্রকৃতিতে আসে এক ভিন্নমাত্রা। গ্রীষ্মের তাপদাহে চৌচির মাঠ-ঘাট খাল-বিল বনবীথিকায় জাগিয়ে তোলে নবীন প্রাণের ছন্দ, আবহমান বাংলার রূপ হয় অপরূপ রূপবতী সলিল দুহিতা।
আবহমান বাংলার প্রাণ-প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন, ‘ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি’। মহাকবি কালিদাস, জয়দেব, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশই নয় শুধু, বাংলা সাহিত্যের খ্যাত-অখ্যাত বহু কবিই বর্ষার রূপ-ঐশ্বর্যে মোহিত-মুগ্ধ, উচ্ছ্বসিত-মুখর হয়ে বর্ষার আবাহনে সৃজন করেছেন গল্প-কবিতা, গেয়েছেন গান। যা বাঙালির অনন্য সম্পদ। সেসব সম্পদ নিয়েই রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা আয়োজনে এবারও বর্ষাবরণ করবে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এর মধ্যে নাচ, গান, আবৃত্তি ও কথনসহ বর্ণিল আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় বর্ষা উদযাপন করবে বর্ষা উদযাপন পরিষদ। আজ সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে সেতারে নবীন শিল্পী সোহানী মজুমদারের রাগ আহীর ভৈরব পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এ আয়োজন।
এরপর বর্ষা কথন পর্বের আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি শিল্পী কাজী মিজানুর রহমান ও ঘোষণা পাঠ করবেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট। সভাপতিত্ব করবেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ড. নিগার চৌধুরী।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে এর পরেই থাকবে গান, নাচ, আবৃত্তিসহ নানা আয়োজন। ধরিত্রীকে সবুজ করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠানে শিশু-কিশোরদের মাঝে বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হবে।
এ ছাড়াও রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীর লালন কালচারাল সেন্টারে ‘রঙ্গে ভরা বঙ্গ’ অনুষ্ঠানে বিকাল ৪টায় থাকছে নাচ-গান-কথামালাসহ বর্ষা আবাহনের নানা আয়োজন। বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে সকাল সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর বর্ষাবরণ অনুষ্ঠান।