আরমান হেকিম
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৫ ১৫:০৮ পিএম
আপডেট : ১২ জুন ২০২৫ ১৫:১০ পিএম
কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ২০২১ সালে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) সঙ্গে ২৫০ মিলিয়ন ইউরো ঋণচুক্তি করেছিল বাংলাদেশ সরকার। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল করোনা টিকা কেনা, স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ। কিন্তু তিন বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও এই অর্থের এক ইউরোও দেশে আসেনি।চুক্তির আওতায় ঋণের অর্থ টিকা কেনায় ব্যয় হওয়ার কথা থাকলেও এখন সরকার সেই অর্থের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে জানিয়েছে, নতুন করে কোভিড টিকা কেনার প্রয়োজন নেই। এর প্রেক্ষিতে সরকার এখন টিকার সেই অর্থ দিয়ে সরকারি কর্মচারীদের জন্য হাসপাতাল নির্মাণ ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের (এনআইসিভিডি) আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা করছে।
এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) গত সপ্তাহে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করেছে এবং আগামী সপ্তাহে আরেকটি বৈঠকের আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে ইআরডির ইউরোপ উইংয়ের প্রধান এবং অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে হাসপাতাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি এই ঋণের একটি অংশ এনআইসিভিডির সক্ষমতা বাড়াতেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। তার আগেই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জানিয়ে দেয়, তাদের আর নতুন করে কোভিড টিকা কেনার প্রয়োজন নেই। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়, যাতে এই অর্থ ইপিআই (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) কার্যক্রমে বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব আসে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
থেকে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু টিকা কেনার মধ্যেই এই ঋণের ব্যবহার সীমাবদ্ধ
নয়। বরং মহামারির পরবর্তী প্রস্তুতি, স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জরুরি চিকিৎসা
সরঞ্জাম কিনতে এই অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে।
গত ১৭ মে ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদির সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ‘বাংলাদেশ কোভিড-১৯ পাবলিক হেলথ প্রোগ্রাম ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অব সাসটেইনেবল হেলথ সার্ভিসেস’ প্রকল্পের আওতায় অব্যবহৃত অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের হাসপাতাল সম্প্রসারণ এবং এনআইসিভিডির আধুনিকীকরণ এই দুই উদ্যোগকে সম্ভাব্য খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে ইআইবি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে প্রকল্প পরিকল্পনা, কেনাকাটার পরিকল্পনা এবং সাধারণ জনগণকে এই সেবার আওতায় আনার নিশ্চয়তা চেয়েছে।
ইআরডির যুগ্ম সচিব ড. রোকসানা তারান্নুম বলেন, ‘ইআইবি আমাদের কাছে বিস্তারিত প্রস্তাবনা চেয়েছে। তারা জানিয়েছে, হাসপাতাল নির্মাণ ও হৃদরোগ ইনস্টিটিউট সম্প্রসারণ প্রকল্প চুক্তির আওতায় থাকতে পারে, তবে এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে।’
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত হাসপাতাল প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা এবং কীভাবে সাধারণ মানুষও সেখানে চিকিৎসাসেবা পাবে, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবে।
ইআরডির ইউরোপ উইংয়ের প্রধান এবং অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে হাসপাতাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি এই অর্থের একটি অংশ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) সেবা সুবিধা উন্নয়নে ব্যবহারের বিষয়েও ভাবা হচ্ছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘এই ঋণ যদি শুরুতেই ছাড় হতো, তাহলে কোভিডকালীন জনগণ উপকৃত হতো এবং একই সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হারের ওপর চাপ কমত।’
তিনি আরও বলেন,
‘এই অর্থ ব্যয় করতে হবে এমন অবকাঠামোয়, যা শুধু সরকারি কর্মচারীদের নয়, সাধারণ মানুষকেও
সরাসরি সেবা দেবে। সেদিক থেকে এনআইসিভিডির সম্প্রসারণ অনেক বেশি যৌক্তিক।’
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, কোভিডকালীন এই অর্থের ব্যবহার না হওয়াটা ছিল নীতিগত দুর্বলতা এবং ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। এখন নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে যদি এই অর্থ জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে কিছুটা হলেও অর্থের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যাবে। তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ ও জনকল্যাণমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে।