সাইফ বাবলু
প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৫ ১০:০১ এএম
জাতিসংঘের পক্ষে শান্তির অগ্রদূত (শান্তিরক্ষী) হয়ে বিশ্বশান্তিতে অনন্য নজির স্থাপন করে চলছে বাংলাদেশ সশস্ত্র ও পুলিশবাহিনী। বিশ্বময় শান্তি রক্ষায় কাজ করতে গিয়ে গত ৩৮ বছরে জীবন উৎসর্গ করেছেন সেনা, নৌ ও বিমান এবং পুলিশবাহিনীর ১৬৮ জন সদস্য। এসব মিশনে আহত হয়েছেন ২৭২ জন। আফ্রিকা মহাদেশসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধে জর্জরিত দেশগুলোতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিজেদের জীবন বাজি রেখে সাহসিকতা, বুদ্ধিমত্তা আর পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের বীর সন্তানরা।
আজ ২৯ মে, আন্তজার্তিক শান্তিরক্ষী দিবস। দিবসটি যথাযথ গুরুত্ব সহকারে উদযাপন করতে সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশবাহিনীর পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা, জাতিসংঘের মহাসচিব, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা, সেনা, নৌ, বিমান ও পুলিশবাহিনীর প্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার। দিবসটি উপলক্ষে শান্তিরক্ষী দৌড় বা র্যালি উদ্বোধন করবেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আহত ২ শান্তিরক্ষীকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে।
আমর্ড ফোর্সেস ডিভিশন (এএফডি) বা সশস্ত্র বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব শান্তিত্বে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে; জাতিসংঘ ইরাক-ইরান সামরিক পর্যবেক্ষক গ্রুপ মিশনে ১৫ জন পর্যবেক্ষক পাঠানোর মাধ্যমে। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮৯ সালে শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দেয় বাংলাদেশ পুলিশ। এরপর ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা অভিযানে যোগ দেয়। ২০১১, ২০১৪, ২০১৫ এবং ২০২১ সালে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয় সেনা প্রেরণকারী দেশ ছিল। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৪৩টি দেশ বা স্থানে ৬৩টি শান্তিরক্ষা মিশন বা কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। এসব মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ২ লাখ ৫৫৮ জন শান্তিরক্ষী অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয় সেনা প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে একটি। বর্তমানে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকান, সাইপ্রাস, আবেই, ডিআর কঙ্গো, লেবানন, লিবিয়া, দক্ষিণ সুদান, ইউএসএ, পশ্চিম সাহারা এবং ইয়েমেনে ৫ হাজার ৮১৮ জন শান্তিরক্ষী মোতায়েন রয়েছে। ইতোমধ্যে ৩ হাজার ৬৪৫ নারী শান্তিরক্ষী তাদের মিশন সফলভাবে শেষ করেছে। বর্তমানে ৪৪৪ নারী শান্তিরক্ষী মোতায়েন রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী হিসেবে শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বেশ কিছু বাড়তি দায়িত্বও পালন করেন। বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকাও পালন করেন তারা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত দেশ পুনর্গঠনে দক্ষতা দেখিয়ে তারা একদিকে পাচ্ছে স্থানীয়দের ভালোবাসা, অন্যদিকে অর্জন করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারও। একসময় শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে শীর্ষে অবস্থান করা বাংলাদেশ এখন অনেক দেশের রোল মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এএফডির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব শান্তি রক্ষায় অভিযান চালাতে গিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ১৪৪ জন জীবন উৎসর্গ করেছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেই তাদের শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। জীবন উৎসর্গ করা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ১৩১ জন সেনাবাহিনীর, ৪ জন নৌবাহিনীর এবং ৯ জন বিমানবাহিনীর সদস্য।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) পরিচালক লে. কর্নেল সামি উদ-দৌলা চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও শান্তিরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সেনা নৌ ও বিমানবাহিনী। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনকারী দেশ হিসেবে ১১৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একাধিকবার শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী হিসেবে শীর্ষ অবস্থানে ছিল। জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়েও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে শেষ করেছে। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সব ধরনের পরিবেশে কাজ করতে দক্ষ। তাই অন্যান্য দেশের সশস্ত্র বাহিনীর তুলনায় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সহজেই নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে।
শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ পুলিশ
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের পদযাত্রা সূচিত হয় ১৯৮৯ সালে নামিবিয়া মিশনের মাধ্যমে। শুরু থেকে আজ অবধি বাংলাদেশ পুলিশের ২১ হাজার ৮১৫ জন শান্তিরক্ষী ২৪টি দেশে ২৬টি মিশনে পেশাদারত্ব ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্ব শান্তিরক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছেন বাংলাদেশ পুলিশের ২৪ জন শান্তিরক্ষী। ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যরা। ইতোমধ্যে ১ হাজার ৯২৭ জন নারী পুলিশ শান্তিরক্ষী বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব সম্পন্ন করেছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক (এআইজি মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, বাংলাদেশ পুলিশের আজকের জনমুখী পুলিশিংয়ের প্রত্যাশার পেছনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনের অনন্য সুযোগ, অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার গুরুত্ব রয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ পুলিশের গৌরবদীপ্ত ও অনন্যসাধারণ ভূমিকা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। দেশের অভ্যন্তরে পুলিশি সেবা প্রদানের ব্রত নিয়ে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জাতিসংঘের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত থেকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ পুলিশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।