ফয়সাল আহম্মেদ
প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৫ ১১:৩৯ এএম
আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৫ ১১:৫১ এএম
বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের সেভেন সিস্টার্সে যাওয়ার রেলপথ প্রকল্প স্থগিতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে তারা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভারতের জন্য সুবিধা হতো। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্যও সেভেন সিস্টার্সের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খুলত।
গত রবিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘শ্রমিকদের নিরাপত্তা’ এবং ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা’ কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ড দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে (সেভেন সিস্টার্সে) যাওয়ার রেলপথ সংযোগ প্রকল্পের অর্থায়ন ও নির্মাণকাজ স্থগিত করেছে ভারত।
জানা যায়, ভারতের তরফ থেকে প্রায় ৫,০০০ কোটি রুপির রেল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে আখাউড়া-আগরতলা, খুলনা-মোংলা ও ঢাকা-জয়দেবপুর প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিল। যার মাধ্যমে সংকীর্ণ ও কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেন নেক’-এর ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। কিন্তু ‘শ্রমিকদের নিরাপত্তা’ এবং ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা’ কারণ দেখিয়ে ভারতীয় অর্থায়নে চলমান ও পরিকল্পিত রেল প্রকল্পগুলো হঠাৎ করেই স্থগিত ঘোষণা করেছে ভারত সরকার।
এই স্থগিতাদেশ সরাসরি প্রভাব ফেলছে তিনটি বড় প্রকল্পে এবং পাঁচটি সম্ভাব্য রুটের জরিপ কাজেও। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগ: ভারত সরকারের অনুদানে ১২.২৪ কিমি দীর্ঘ এই রেলপথের ৬.৭৮ কিমি বাংলাদেশ অংশে অবস্থিত। প্রকল্পটি ভারতের সরকারের প্রায় ৪০০ কোটি রুপি সাহায্যে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল। কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ এই প্রকল্পের অংশ এবং এর উদ্দেশ্য ছিল, বিদ্যমান বাণিজ্যপথ ব্যবহার করে আসামের সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধি করা এবং নতুন রেলপথ স্থাপন।
খুলনা-মোংলা রেলপথ : প্রায় ৩,৩০০ কোটি রুপির এই প্রকল্প মোংলা বন্দরকে বাংলাদেশের প্রধান রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার কথা ছিল। প্রকল্পটি একটি সুবিধামূলক ঋণের অধীনে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পটির আওতায় মোংলা বন্দর এবং খুলনায় বিদ্যমান রেল নেটওয়ার্কের মধ্যে প্রায় ৬৫ কিমি প্রশস্ত গেজ রেলপথ নির্মাণ হওয়ার কথা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্দর মোংলা প্রশস্ত গেজ রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে।
ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর রেল সম্প্রসারণ: প্রায় ১৬০০ কোটি রুপির এই প্রকল্প ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সহায়তায় চলছিল। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু গত বছর পর্যন্ত প্রকল্পটির ৫০ শতাংশও সম্পন্ন হয়নি।
জানা গেছে, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বিকল্প পথ ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ থেমে যাওয়ায় দিল্লি এখন তাকাচ্ছে ভুটান ও নেপালের দিকে। নতুন পরিকল্পনায় নয়াদিল্লি এখন উত্তর ভারতে রেল অবকাঠামো শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে এবং ভুটান ও নেপালের মাধ্যমে বিকল্প সংযোগ স্থাপনের পথ খুঁজছে।
জানা যায়, ভারত এখন দেশের ভেতরে এবং বিকল্প আঞ্চলিক কৌশলগুলোর দিকে নজর দিচ্ছে। ভারত সরকার উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে শিলিগুড়ি করিডোরে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ রেলপথগুলোর ক্ষমতা এবং নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে লাইনের ডাবলিং এবং কোয়াড্রুপলিংয়ের সম্ভাবনা যাচাই করছে। ‘জরিপ কাজ চলছে’ বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন একজন ভারতীয় রেল কর্মকর্তা।
একই সময়ে ভারত-নেপাল রেল চুক্তি এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কাছেই ভুটানের অবস্থানকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লি ভুটান এবং নেপালের মাধ্যমে রেল সংযোগের সম্ভাবনা অনুসন্ধান করছে বলেও জানা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রুটগুলো লজিস্টিক দিক থেকে জটিল হলেও, তা ভারতের সংযোগের বিকল্প এবং বাংলাদেশে নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ভারত ও নেপালের মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর জন্য বিরাটনগর থেকে নিউ মাল ১৯০ কিমি নতুন রেলপথ এবং গলগালিয়া থেকে ভদ্রপুর ও কাজলি বাজারে ১২.৫ কিমি রেলপথ তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল। ‘চিকেন নেক’ অঞ্চলের সংযোগ উন্নত করতে ভারত পশ্চিমবঙ্গের কুমেদপুর থেকে অম্বরী ফালাকাটা পর্যন্ত ১৭০ কিমি নতুন রেলপথ এবং বাংলার সঙ্গে বিহারের সংযোগ বাড়াতে ২৫ কিমি নতুন রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে।
ভারতের অর্থায়নের প্রকল্প স্থগিত প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সেভেন সিস্টার্সে যাওয়ার রেলপথ প্রকল্প শুরু হয়নি এখনও। ভারত সরকার এ প্রকল্পে বিনিয়োগের ব্যাপারে বাংলাদেশের গত সরকারের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ায় এসেছিল।’ তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্প স্থগিতের ফলে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হবে না, তবে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভারতের জন্য সুবিধা হতো। তাদের সেভেন সিস্টার্সের সঙ্গে যোগাযোগের সহজ রাস্তা তৈরি হতো। এর ফলে বাংলাদেশও সেটা ব্যবহারের সুযোগ পেত। তবে এই মুহূর্তে আমাদের যে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে ভারত সরকারের প্রকল্প স্থগিতের কারণে তাতে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না।’
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ঘাটতির কারণে প্রকল্প স্থগিত হলো কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘প্রকল্প স্থগিতের পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। এটা একটা বড় ধরনের নির্মাণপ্রকল্প। এই ধরনের একটা সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাস্তবায়ন না করে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা সাপেক্ষে করার উদ্যোগ হয়তো দেশটি নিতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘কারণ এটার রুট কি হবে, ফি কীভাবে নির্ধারিত হবে, কী প্রটোকলের মধ্য দিয়ে যাবে, স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরগুলো কী হবে এগুলো ফাইনালাইজ করতে হবে। সে জিনিসগুলো হয়তো সে দেশের সরকার পরবর্তীতে করার চিন্তা-ভাবনা করবে।’ এই মুহূর্তে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে উভয় পক্ষেরই আগ্রহের অভাব আছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সেভেন সিস্টার্সে যাওয়ার জন্য সরাসরি কোনো প্রকল্প ছিল না। প্রজেক্ট ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। যেমন বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ সংযোগ রেল লাইন, খুলনা থেকে দর্শনা ডাবল লাইন এবং কাউনিয়া থেকে পার্বতীপুর ডুয়েলগেজ কনভারশন প্রকল্প। এসব প্রকল্পে ভারত সরকার অর্থের জোগান দেবে না। এগুলোর সঙ্গে সেভেন সিস্টার্সের কোনো কানেক্টটিভিটি নেই।’ তিনি বলেন, ‘তবে আখাউড়া থেকে আগরতলার সঙ্গে সেভেন সিস্টার্সের সংযোগ আছে। এটি বাস্তবায়িত হয়েছে। যে প্রকল্পগুলো স্থগিত করা হয়েছে সেগুলোর কাজ শুরুই হয়নি।’
প্রকল্পগুলো স্থগিতে বাংলাদেশের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে কি না? এমন প্রশ্নের উত্তরে রেলওয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘হলে ভালো হতো, না হলে কিছু করার নেই। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ সংযোগকারী লাইন আগেও ছিল না, প্রকল্প স্থগিত না হলে কাউনিয়া-পার্বতীপুর ডুয়েলগেজ লাইনে মিটারগেজের পাশাপাশি ব্রডগেজও চলতে পারত। অন্যদিকে খুলনা-দর্শনা ডাবল লাইন হলে ট্রেনের ক্যাপাসিটি সংখ্যা বাড়ত।’ এগুলো ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ছিল সে ক্ষেত্রে বিলম্বে বাস্তবায়ন হলেও সমস্যা নেই বলে জানান রেলওয়ে মহাপরিচালক।