রেজাউল করিম, গাজীপুর ও শরীফুজ্জামান ফাহিম, সাভার (ঢাকা)
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৫ ১০:০৬ এএম
আপডেট : ২০ মার্চ ২০২৫ ১০:০৬ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বেতন-ভাতার দাবিতে প্রায়ই সাভার ও গাজীপুরে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা যায়। দাবি আদায়ে পোশাক শ্রমিকরা গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। তবে আসছে ঈদকে সামনে রেখে এ বিক্ষোভের মাত্রা অনেকগুণ বেড়েছে। বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাসের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকরা। নেমে আসছেন রাস্তায়। ফলে ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষ পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। সাভার এবং গাজীপুরে প্রতিদিনই কোনো না কোনো কারখানায় আন্দোলন হচ্ছে। সেখানকার বেশিরভাগ কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ করা হয়নি বলে জানিয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলো।
পোশাক খাত অস্থিরতার দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন জাতীয় গার্মেন্টস ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও আশুলিয়া থানা কমিটির সভাপতি ফরিদুল ইসলাম। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সামনে পরিস্থিতি একটু ঘোলাটে হচ্ছে। কারখানা মালিকরা যদি আন্তরিক থাকেন, তবে আর আন্দোলন হবে না। তবে আরও কয়েক দিন গেলে বুঝতে পারব।’
গতকাল গাজীপুরের কোনাবাড়ি জরুন এলাকায় পোশাক শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করছেন। ঈদ বোনাস, ছুটির টাকা ও চলতি মাসের অর্ধেক বেতনের দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন কারখানার সাড়ে ৮০০ শ্রমিক। সকাল ৯টার দিকে নগরীর জরুন (আলিফ গ্রুপের) স্বাধীন গার্মেন্টসের অভ্যন্তরে শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেন।
আগের দিন গাজীপুর সদর উপজেলার বানিয়ারচালা এলাকায় একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা ছুটি বৃদ্ধি ও হোতাপাড়া এলাকায় খাদ্য উৎপাদন কারখানার শ্রমিকরা বেতনের দাবিতে সকাল থেকে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় খাদ্য উৎপাদন কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন।
শিল্পপুলিশ ও কারখানার শ্রমিকরা জানান, গাজীপুর সদর উপজেলার হোতাপাড়া এলাকায় ফু-ওয়াং ফুড লিমিটেড কারখানায় ৬৫০ জন শ্রমিক কাজ করেন। চলতি মাসের ১৭ দিন চলে গেলেও মঙ্গলবার পর্যন্ত তাদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়নি। সদর উপজেলার বানিয়ারচালা এলাকার জায়ান্ট টেক্সটাইল লিমিটেড নামের একটি পোশাক তৈরি কারখানার শ্রমিকরা সকাল সাড়ে ৭টার থেকে কাজ বন্ধ করে কারখানার ভেতরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা কারখানার মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ওমর ফারুকের পদত্যাগ ও ঈদুল ফিতরের ছুটি ১১ দিনের দাবি জানান।
জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হালিম জানান, বেতনের দাবিতে শ্রমিকরা মহাসড়কে দাঁড়িয়ে অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যানবাহন চলাচল শুরু করে।
আশুলিয়ায় মদিনা বেগম নামের এক নারী পোশাক শ্রমিক বলেন, ঈদের পর কারখানা চালুর আগেই তো আমাদের বেতন হয়ে যাওয়ার কথা। সেই বেতনটা আগে দিলে আমরা ভালোভাবে ঈদ কাটাতে পারতাম। এসব নিয়ে কারখানায় দাবি জানিয়েছি। দেখা যাক মালিকপক্ষ কী বলে। তবে আমরা সবাই এই দাবির পক্ষে। না হলে আন্দোলনে যেতে পারি।
তবে ঈদের আগে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের বোনাস ছাড়াও চলতি মাসের কমপক্ষে ১৫ দিনের বেতন দিতে হবে বলে কারখানার মালিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। একই সঙ্গে সুযোগ থাকলে ঈদের দুই-তিন দিন আগে ছুটি দিতে কারখানার মালিকদের অনুরোধ করেছে সংগঠনটি।
বিজিএমইএর মহাসচিব মো. ফয়জুর রহমান সংগঠনের সদস্য কারখানার মালিকদের এক নোটিসে জানিয়েছেন, পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে শ্রম পরিস্থিতি এবং শিল্প খাতের শ্রমিকদের মজুরি, বোনাস ও ছুটি সংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনার জন্য ৬ মার্চ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের ৮৫তম সভা হয়। মালিক, শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধিসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ঈদের আগে পোশাক শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের মার্চ মাসের কমপক্ষে ১৫ দিনের মজুরি দিতে হবে। ফলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে কারখানার মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানান সংগঠনের মহাসচিব।
জানা যায়, গত বছরের জুনে বেতন বৃদ্ধি, আগস্ট থেকে বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন করেছেন সাভার আশুলিয়ার কারখানার শ্রমিকরা। পরে বিজিএমইএ থেকে বিভিন্ন নির্দেশনা ও দাবি যাচাই-বাছাই শেষ করে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল টিফিন ও হাজিরা বোনাস বৃদ্ধি। হাজিরা বোনাস হিসাবে মাসে অতিরিক্ত ২২৫ টাকা ও টিফিন বিল বাবদ দৈনিক অতিরিক্ত ১০ টাকা করে দেওয়া হবে তাদেরকে। একই সঙ্গে নাইট বিল ন্যূনতম ১০০ টাকা করা হয়। এতে আন্দোলন কিছুটা কমলেও ঈদকে সামনে রেখে নিত্যনতুন দাবি উঠছে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে।
শ্রমিকরা বলছে, মালিকদের গাফিলতি, কারখানায় অর্ডার না থাকা ও সঠিক সময়ে ব্যাংক ঋণ না পাওয়াকে আন্দোলনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক মনে হলেও অস্বাভাবিক হতে সময় লাগবে না। ছুটি ও বেতন নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ জমে আছে। তারা হয়তো জানাচ্ছে। অনেক কারখানা মানতে পারে আবার নাও মানতে পারে। আবার কিছু কারখানা ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন
বিজিএমইএ থেকে নির্দেশনা রয়েছে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সব কারখানার ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন, ঈদের বোনাস ও মার্চ মাসের অর্ধেক বেতন পরিশোধ করার। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কারখানায় ঈদের বোনাস দেওয়া হয়নি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঈদের বোনাস না পেলে সন্তোষ দেখা দিতে পারে। এজন্য গাজীপুর শিল্পপুলিশ ২ থেকে শ্রমিকদের উদ্দেশ্য সচেতনতা সতর্কতামূলক লিফলেট বিতরণ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। শৃঙ্খলা ফেরাতে বর্তমানে ৫৫০ জন শিল্পপুলিশের সদস্য নিয়োজিত রয়েছে। এ ছাড়াও ঈদের আগে ৬০০ জন করা হবে।
আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন ও শ্রম পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে মনিটরিং করতে শ্রমিক হেল্পলাইন নম্বর ১৬৩৫৭ (টোল ফ্রি) চালু করা হয়েছে।
১৪ মাসে ৬৪ দিন শ্রমিক আন্দোলনে উত্তাল গাজীপুর
গাজীপুরে বেতন-বোনাসের দাবিতে, কখনও তৃতীয় পক্ষের উস্কানি ও রাজনৈতিক কারণে গত ১৪ মাসে গাজীপুরে ৬৪ দিন শ্রমিকরা উত্তাল ছিল গাজীপুর। এসব ঘটনার জের ধরে ঘটে বিক্ষোভ, সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ড। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষও হয়েছে অনেক বার।
জানা যায়, ২০২৪ সালে জানুয়ারিতে ৭ দিন, ফেব্রুয়ারিতে ১ দিন, মার্চে ৫ দিন, জুনে ১ দিন, জুলাইয়ে ২ দিন, আগস্টে ৪ দিন, সেপ্টেম্বরে ৮ দিন, অক্টোবরে ৪ দিন, নভেম্বরে ১৪ দিন ও ডিসেম্বরে ৫ দিন শ্রমিক আন্দোলন চলে। এ ছাড়াও চলতি বছরের ১৩ দিন শ্রমিক আন্দোলন ও অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে।
অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-শ্রমিক-জনতার আন্দোলনের সংগঠক আরমান হোসাইন বলেন, ২৪-এর অভ্যুত্থান পর শ্রমিক অঞ্চলগুলোতে শ্রমিকরা তাদের দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন তার মধ্যে গাজীপুর অন্যতম। পোশাক খাতে অসন্তোষের প্রধান কারণ বকেয়া বেতন ও শ্রমিকদের জীবন মানের উন্নতি। এই বিষয়গুলো বরাবরই এড়িয়ে গিয়ে শ্রমিকদের ওপরে দায় দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের কেন অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সুযোগ নেই, যার মাধ্যমে শ্রমিক তার কারখানার অভ্যন্তরেই সমাধানের সিদ্ধান্ত নিতে পারত।
জানতে চাইলে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘কারখানা বন্ধের কারণ হিসেবে শ্রমিক আন্দোলনকে দায়ী করা যাবে না। কারণ বিগত দিনেও শ্রমিকরা তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিদাওয়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্দোলন করেছে। এভাবে কারখানা বন্ধ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে কি না খতিয়ে দেখা উচিত। কারখানা মালিকদের কৃতকর্মের দায়ে শ্রমিকরা বেকার হচ্ছে, যেটা মোটেও কাম্য নয়।’
গাজীপুর শিল্পপুলিশ-২ এর পুলিশ সুপার একেএম জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ইতোমধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানাসহ বিভিন্ন কারখানা বেতনের দাবিতে গত কয়েক দিন বিক্ষোভ করেছে। ঈদ বোনাস, ছুটির তারতম্য ও বকেয়া বেতনের জন্য শ্রমিকরা ঈদের আগে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে। আশা করছি এ সপ্তাহের মধ্যে ঈদ বোনাস দিয়ে দেবে। আমরা শিল্পপুলিশ সচেতনতামূলক লিফটের বিতরণ করছি শ্রমিকদের মধ্যে।’
মাহমুদ জেনিমস কারখানার ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. আবু তালেব বলেন, ‘বহিরাগত শ্রমিকদের উস্কানিতে বিভিন্ন সময় শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটে। আমাদের কারখানায় শ্রমিকদের বেতন নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তবে পাশের অন্য কারখানায় অসন্তোষের কারণে ও বহিরাগত শ্রমিকদের উস্কানিতে আমাদের কারখানা অনেকবার বাধ্য হয়ে বন্ধ করতে হয়েছে। শ্রমিক অসন্তসের ঘটনায় কারখানা একদিন বন্ধ থাকলে কোটি টাকার মতো লোকসান গুনতে হয়।’
গাজীপুরে অর্ধশত কারখানা বন্ধ
শিল্প-অধ্যুষিত গাজীপুর জেলায় ২ হাজার ১৭৬টি নিবন্ধিত কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৫৪টি তৈরি পোশাক শিল্পকারখানা। এর বাইরেও আছে ছোট ও মাঝারি অজস্র কারখানা। শিল্পপুলিশ ও কলকারখানা অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ডিসেম্বর পর্যন্ত গাজীপুরে অর্ধশত শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়াও চলতি বছরে বেক্সিমকো ও কেয়া কারখানা মিলিয়ে আরও ২০ টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার কর্মহীন ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিক বেকার হয়ে মানবেতর দিনযাপন করছে। বন্ধ থাকা কারখানার এসব শ্রমিকের অনেকেই কারখানা খুলে দেওয়া ও বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রায়ই বন্ধ থাকছে মহাসড়ক।
কারখানার মালিক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে মাঝারি আকারের একটি কারখানা যদি একদিন বন্ধ থাকে, তবে ৭০ লাখ থেকে এক কোটি টাকার ক্ষতি হয়। বড় কারখানা ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয় এটি পণ্য অর্ডারের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। বেতন ভাতার যে দাবি এটি অনেক সময় অর্থনৈতিক কারণেও ব্যাঘাত ঘটে। বিশেষ করে গাজীপুরে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় গ্যাসের সমস্যা রয়েছে। গ্যাসের সমস্যা থাকলে উৎপাদন অনেক কম হয়। আর উৎপাদন কম হলেই বেতন ভাতা পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হয় মালিকদের।
বিজিএমইএ সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে ২ হাজার ১০৭টি পোশাক শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৪০টি কারখানা শনিবার পর্যন্ত ফেব্রুয়ারি মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করে দিয়েছে। তবে ১৬৭টি কারখানা এখনও ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ করতে পারেনি। এর মধ্যে ৪০ কারখানা বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ।